Story About Young Shimanto

61

আসসালামুআলাইকুম
আমি সীমান্ত, পুরো নাম হাসান তাসফিক সীমান্ত।

ছোট বেলা থেকে মানুষের নানা রকমের শখ, ইচ্ছা মনের ভিতর প্রকাশ পায়। আমারও বিভিন্ন ধরনের শখ আর ইচ্ছা ছিল। বছরের শেষ অংশে বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আমরা যেমন এক শ্রেণি থেকে অন্য শ্রেণিতে যেতাম ঠিক তেমন করে আমারও একটা ইচ্ছা কিংবা শখ থেকে নতুন কোন শখ জাগ্রত হতো। এই যেমন পাইলট হওয়া, ফটোগ্রাফি করার ইচ্ছা, গিটার বাজানোর ইচ্ছা, ভায়োলিন বাজানোর ইচ্ছা, ক্রিকেটার হওয়ার ইচ্ছা আরো কত কি!… কিন্তু কোন শখ বা ইচ্ছা গুলো মনের ভিতর ধারণ করতে পারিনি।

একটা সময় টিভি দেখতে দেখতে খেতে বসাটা ছিল আমার নিত্যদিনের স্বভাব। কার্টুন কিংবা ডিসকভারি চ্যানেলের ‘ম্যান ভার্সেস ওয়ার্ডল্ড’ এর সাথে আমার সবচেয়ে প্রিয় চ্যানেল টি ছিল ৬৯ নাম্বার চ্যানেলের ‘FoxLife’ যেখানে রান্না বিষয়ক অনেক ধরনের প্রোগ্রাম দেখাত। সেখান থেকে বিদেশি রান্নার উপর এক ধরনের ঝোঁক সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু তারা যে সকল উপকরণ দিয়ে রান্না করতো তা আমাদের মফস্বল শহরে পাওয়াটা ছিল দুস্কর ব্যাপার। তাই শুধু আগ্রহ নিয়ে দেখেই যেতাম। বিভিন্ন বিখ্যাত শেফদের রান্নার অনুষ্ঠান কিংবা ফুড ট্রাভেলারদের বিভিন্ন দেশের রান্নার ঐতিহ্য তুলে ধরা, তাদের জনপ্রিয় খাবার গুলো খেয়ে দেখা, রান্না করা কিংবা সংস্কৃতি সম্পর্কে জানানো এই সব কিছুই আমার মনের ভিতর আস্তে আস্তে কেমন জানি একটা ভালোলাগা সৃষ্টি করে। মাস্টার শেফ অস্ট্রেলিয়া, ইন্ডিয়া, আমেরিকা এইসব প্রোগ্রাম গুলো আমার খুব ভালো লাগতো।

মনে মনে ভাবতাম ইশ আমিও যদি যেতে পারতাম ওইখানে। আমার মা সরকারি চাকরিজীবী হওয়ায় উনি খুব সকালে উঠে আমাদের জন্য নাস্তা বানাতেন এবং দুপুরের খাবার রান্না করে যেতেন। আমি বড় ছেলে তাই মা কে যত বেশি পারতাম সাহায্য করার চেষ্টা করতাম। অফিসে যাওয়ার আগে উনি আমাকে সব কিছু বুঝিয়ে দিয়ে যেতেন, কোন কোন জিনিস গুলো খাবারের আগে গরম করা লাগবে কিংবা খাবারের পরে ফ্রিজে রাখতে হবে এইসব ব্যাপার গুলো। আমি যখন কলেজে পড়তাম ঠিক তখন থেকেই আমার রান্নাঘরে যাওয়া শুরু হয়। মা যেভাবে দিকনির্দেশনা দিয়ে যেতেন আমিও ঠিক সে ভাবে করার চেষ্টা করতাম। আমি এবং আমার ছোট ভাই আর আব্বু খুব চা খেতাম। একদিন ইউটিউব থেকে একটা প্রোগাম দেখে নতুন একধরনের চা বানাই, এলাচি চা। সবাই খেয়ে এত প্রশংসা করলো আমার খুব ভালো লাগলো। আমার মনে হতো মাস্টার শেফ প্রোগ্রামে বানিয়েছি এবং তারা আমার জাজ। তারা খেয়ে ১০ এ ১০ দিচ্ছে এমন ফিল হতো।

 

আমরাও অনেক মজা করে খেতাম এবং আস্তে আস্তে রান্নার উপর এক ধরনের ভালোবাসার সৃষ্টি হয় এবং আমিও শুরু করলাম টুকটাক এটা সেটা বানানো। আমাদের ফ্যামিলি ছিল যৌথ ফ্যামিলি, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কিংবা ঈদে সবাই একসাথে হতো এবং অনেক মজার মজার রান্না করা হতো। আমরা সব ভাই-বোনেরা একসাথে খেতাম অনেক গল্প করতাম।

আমার মা অনেক মজার মজার রান্না করতো,বিভিন্ন ধরনের নাস্তা বানাতো যেমন- স্যুপ, সালাদ,স্যান্ডুইচ,নুডলস, পিৎজ্জা,বার্গার, চিকেন ফ্রাই, ফ্রাইড রাইস, স্পঞ্জ কেক আরো কতো কি। 

আমি যখন কোন কিছু বানাতাম তখন আমার মা, ছোট ভাই, ফ্যামিলি মেম্বাররা কিংবা বন্ধু-বান্ধবরা অনেক বেশি উৎসাহ দিত এবং খাবার টা কেমন হয়েছে তা বলতো। খাবার রান্না করাটা যে কত কষ্ট তখন আমি বুঝতে পারি।

কিন্তু রান্না করার পর যখন কেউ বলতো অনেক মজা হয়েছে তখন হঠাৎ করেই সব কষ্ট উধাও হয়ে যেত এবং মনের ভিতর একধরনের তৃপ্তি আসতো, ভালোলাগা কাজ করতো। এই ফিলিংস টা ছিলো সত্যিকার অর্থে অন্য রকম।আর ফিলিংস টা পাওয়ার জন্য আমি নতুন নতুন এক্সপেরিমেন্ট করতাম কিন্তু কোনোটা ভালো হতো কোনোটা হতো না। যেগুলো ভালো হতো না, আমার খুব খারাপ লাগতো এতো বেশি লাগতো তা বলে বুঝাতে পারব না। মা ও অনেক বকা দিতো এটা সেটা নষ্ট করার জন্য।

কিন্তু আমার ছোট ভাই তাও মজা করে খেত এবং বলতো সামনের বার আরো মজা হবে। এভাবে করতে করতে কখন যে রান্নাটা আমার শখের জায়গা দখল করে নিয়েছে আমি তা বলতে পারবো না।

কোভিড এর সময় সবাই বাসায় এক বন্দি জীবন পাড় করছিলো। আমার রেড ক্রিসেন্ট এর ভলেন্টিয়ার হবার সৌভাগ্য হয়, কোভিড লকডাউন এর সময় একদম শুরুর দিকে টানা ৪৬ দিন কোয়ারেন্টাইন মেইনটেইন করে, আমারা অফিসে থেকে বিভিন্ন ধরনের কাজ করতাম যেমন- হসপিটালের রেড জোন গুলোতে জীবানুনাশক স্প্রে করতাম,বাজার কিংবা যেসকল জায়গায় রেড জোন থাকতো ওই সমস্ত জায়গায় যাওয়া, কোভিড পজিটিভ মানুষজন কে হাসপাতালে এম্বুলেন্স এর মাধ্যমে আনা-নেওয়া করা, কোভিড আক্রান্ত রোগী যারা কোয়ারেন্টাইন মেইনটেইন করে বাড়িতে চিকিৎসা নিত তাদের অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়া, কোভিডে আক্রান্ত মৃত ব্যাক্তিদের লাশ হাসপাতাল থেকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া। কারণ তখন কোন এম্বুলেন্স কোভিড আক্রান্ত কারোকে পরিবহন করতো না,করলেও প্রচুর টাকা নিত যা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য অনেক ব্যয়বহুল ছিল,আমরা বিনা পয়সায় এইসব কাজ করতাম। আমরা মানুষের দোয়াতে সন্তুষ্ট ছিলাম। আমাদের অফিসে রান্নার ব্যবস্থা ছিল না, তাই আমাদের জন্য বাহিরের থেকে খাবার আসতো এবং মাঝেমধ্যে আমাদের ভলেন্টিয়ারদের বাসা থেকে ওয়ানটাইম বক্সেও খাবার আসতো। যেদিন কারো বাসা থেকে খাবার আসতো সেদিন আমরা অনেক তৃপ্তি সহকারে খাবার খেতে পারতাম। আর আমিও তখন বিভিন্ন মায়েরদের হাতের রান্নার যাদুতে মুগ্ধ ছিলাম। যেদিন আমার মায়ের হাতের রান্না আসতো সেদিন আমার ঈদ ঈদ লাগতো।। কোভিড ১৯ আমাদের থেকে অনেক কিছু ছিনিয়ে নিয়ে গেলেও আমাদের কে অনেক কিছু অনুভব করা শিখিয়ে দিয়ে গেছে।

 

এরপর আস্তে আস্তে যখন সব স্বাভাবিক হওয়া শুরু হলো তখন একদিন ইউটিউব থেকে তেলাপিয়া মাছ দিয়ে একটা ফিশফ্রাই রান্না করা শিখলাম,বাসায়ও বানালাম এবং সবাই খুব প্রশংসা করলো। আমাদের মফস্বল শহরে ফিশ আইটেম এর কোন রেস্টুরেন্ট ছিল না, আর তেলাপিয়া মাছ যখন সব সময় পাওয়া যায় তাই ভাবলাম বাসা থেকে বানিয়ে হোম ডেলিভারির মাধ্যমে একটা বিজনেস করা শুরু করবো। যে চিন্তা সে কাজ, বন্ধুদের সহযোগিতায় আর ফ্যামিলির সাপোর্টের জন্য ১ মাসের মধ্যে ফুড পান্ডায় নাম এন্ট্রি করিয়ে সকল কাগজ পত্র, মেনু, অনলাইনে প্রচার-প্রচারণা সব করে ফুড পান্ডার ডিভাইস হাতে পেয়ে গেলাম।

অনেকবার বন্ধুদের কিংবা ফ্যামিলি মেম্বারদের খাইয়ে ফুড ট্রায়াল সেরে নিয়েছিলাম। সবাই খুব সাপোর্টিভ ছিল এবং উৎসাহ দিচ্ছিলো। আমি খুব বিশ্বাসী ছিলাম এটা ক্লিক করবেই। রান্নার উপর কোন ধরনের অভিজ্ঞতা ছাড়াই,পড়াশোনা ছাড়াই, জিনিসটাকে খুব সহজ ভেবে আমি যে এতো বড় একটা পদক্ষেপ নিয়েছিলাম তা তখনও হয়তো আমি চিন্তা করি নাই। ২১ শে জুলাই ২০২০ সে মাহেন্দ্রক্ষণ চলে এসেছিল,ওইদিনই প্রথম চালু করলাম আমার “ফিশ প্লেটার” নামের হোম ডেলিভারি রেস্টুরেন্ট। সারাদিন খুব আগ্রহ নিয়ে ডিভাইসটা কে সাথে নিয়ে বাসার রান্নাঘরে বসে ছিলাম, তখন পর্যন্ত একটা অর্ডার ও আসলো না। বন্ধুরা ফোন দিয়ে খবর নিচ্ছিলো,আম্মু অফিস থেকে ফোন দিয়ে খবর নিচ্ছিলো আর আব্বু বাসায় ছিল। আগের দিন রাতে একটুও ঘুমাইতে পারিনাই এক্সাইটেড ছিলাম।

এরপর ডিভাইস টাকে সাথে নিয়ে শুয়ে ছিলাম,কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম বলতে পারবো না। উঠে দেখি প্রায় বিকাল শেষে সন্ধ্যা। তখন ও অর্ডার আসলো না কোন। নিজের মোবাইল দিয়েও চেক করলাম ফুড পান্ডার এ্যাপে সব কিছু ঠিক ছিলো কিনা,কোন সমস্যা হচ্ছে নাকি। দেখলাম, এবং সব কিছুই ঠিক ছিলো। এরপর রাতে বন্ধুরা বাসায় চলে আসলো যেন না ভেঙে পড়ি,তাদের কে ৫০% ছাড়ে প্রথম খাওয়ালাম। তখন অনেক বেশি হযবরল লাগছিলো,টাইম মতো হচ্ছিলো না। তারাও সময় ধরলো,সময় মতো সার্ভিস করতে পারি কিনা। হলো না অনেক সময় লাগলো এবং তখনই খুব বিরক্ত লাগা শুরু করলো। রাতে ঘুমানোর সময় মাথায় ঘুরপাক করতেছিল কোথায় কোথায় সময় বেশি লাগছে এবং কিভাবে আরো তাড়াতাড়ি করা যায়। পরেরদিন আবার ও সে অপেক্ষা কিন্তু কোন অর্ডার আসলো না। আর এভাবেই চলতে থাকলো কয়েকদিন। নিজে থেকে বিরক্ত লাগা শুরু করলো, আব্বুর থেকে ধার করে ৫ হাজার টাকা ইনভেস্ট করে কতো কিছু কিনলাম,যা যা প্রয়োজন ছিলো। এগুলাই তখন মাথায় ঘুরতেছিলো।

অবশেষে নিজেরই এক বন্ধু ফুডপান্ডায় অর্ডার করলো এবং তখনই প্রথম আমার ডিভাইসে সাউন্ড করলো, ২৫ মিনিট সময় দিলো। ডেলিভারি ম্যানও বাসায় চলে এসেছে ১০ মিনিটের মাথায়। একটা যুদ্ধ গেল ২৫ মিনিট শেষ কিন্তু আমার ফুড রেডি হচ্ছিলো না,সেও বিরক্ত প্রকাশ করা শুরু করলো। এবং শেষমেশ ৩৫ মিনিটে ফুড হ্যান্ডওভার করি, সেও অনেক কথা শুনাইলো এতো দেরি এই সেই। এরপর ডিভাইস টা বন্ধ করে দেই, আর একদমই ইচ্ছা করছিলো না চালিয়ে যেতে। নিজের ভিতর এতো পরিমাণ খারাপ লাগছিলো যা বলে বুঝাতে পারবো না। ইচ্ছা করছিলো সব ফেলে দেই আরো কত কি মাথার ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছিলো। ২০ মিনিট পর বন্ধুর ফোন, সে এবং তার কলিগরা সবাই মিলে শেয়ার করে খেয়েছিলো,অনেক মজা হয়েছে খাবার টা সবাই বলছিলো। তখন কিছুটা মনে শান্তি পাই। কিন্তু সাহস করে ডিভাইস টা আর অন করিনি,কারণ বন্ধু বলে সে হয়তো কিছু বলে নাই,কিন্তু যারা ক্ষুদার্থ থাকবে তারা নিশ্চয়ই ছাড় দিবে না আমাকে এই ভেবে।

সন্ধ্যায় সেনাবাহিনীতে জব করে, একটা ফ্রেন্ড ফোন দিয়ে বললো রাতে আন্টির জন্য একটা প্যাকেজ নিয়ে যেতে। তাও করলাম কিন্তু কোন ভাবেই টাইমলি করতে পারতছিলাম না। আন্টি সহ বাসার সবাই খুব ভালো ফিডব্যাক দিয়েছিলো। আসার সময় একটা দীঘীর পাড়ে বসে অনেক কিছু চিন্তা করতে থাকলাম, কোথায় সমস্যা হচ্ছে, কি করা যায়, কি করবো এইসব। মনের ভিতর একধরনের আলাদা অনুভূতি লাগতো যখনই ভালো ফিডব্যাক শুনতাম তাই হাল ও ছাড়তে ইচ্ছে করছিলো না। এভাবেই সময় কেটে যাচ্ছিলো। কয়েকদিন পার হলো কোন অর্ডার আর আসলো না,বাসায় বড় ভাই – বন্ধুদের,ফ্যামিলি-মেম্বারদের কে বিভিন্ন সময় খাইয়ে ইতি টানলাম। যা আসলে খুব সহজ মনে করেছিলাম, তা আসলে এতো সহজ না, একার পক্ষে সম্ভব না,ফুডের বিষয়ে ভালো অভিজ্ঞতা না নিয়ে শুধুমাত্র টিভি আর ইউটিউব দেখে এতো বড় রিস্ক নেওয়াটাও ঠিক হয় নি। এইসব কিছু আরো কয়েকদিন রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে দেয়নি আমাকে। তবে নতুন একটা অভিজ্ঞতা হলো, জিনিস-পত্র কিনা থেকে বাজার করা, কিছু মানুষের সাথে পরিচয় হওয়া, একটা কিছুতো শুরু করতে পারেছিলাম, এইভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম। ভালো মুহূর্ত গুলো মনে করতাম,যখন রিভিউ গুলা মনে পড়তো, ওই সময়টার কথা চিন্তা করতাম।

 

এরপর সিদ্ধান্ত নেই আমি কুকিং এর উপর পড়াশোনা করবো,আমাকে শিখতে হবে। এভাবেই কয়েকমাস চলে গেল,তখন আমার ডিগ্রি সেকেন্ড ইয়ার শেষ হয়ে ফাইনাল ইয়ারে উঠলাম। তেমন ক্লাস করতে হতো না,বলতে গেলে একদমই না। শুধু ফাইনাল পরীক্ষা আর ইনকোর্স গুলো দিতাম। ভালো ছাত্রও ছিলাম না, কোনভাবে পাশ করে ইয়ার শেষ করতাম। খোঁজা শুরু করি বাংলাদেশের সবচেয়ে বেস্ট কোথায় পড়লে কুকিং সম্পর্কে ভালো জ্ঞান অর্জন করতে পারবো। অনেক গুলো ইন্সটিটিউট পেয়ে যাই কিন্তু বাসায় প্রথম দিকে রাজি হচ্ছিলো না। আমার বাবা-মা দুইজনই ব্যাংকার, চাচা-জ্যাঠা-ফুফুরাও বেশিরভাগ ব্যাংকার। বলতে গেলে একটা ব্যাংকার ফ্যামিলির মেম্বার আমরা। কিন্তু সেখানে রান্না-বান্নার জগতে যাওয়ার দিকে মনোনিবেশ করার জন্য আমাকে একটু কঠিন সময় পার করতে হয়েছে যা খুব স্বাভাবিক। এমনিতেও জীবনের নেওয়া প্রথম চেষ্টা টাই ছিলো আমার ব্যার্থ রান্না বিষয়ে, তাই একধরনের চাপ ছিলো। 

শুরুর দিকে রাজি না থাকলেও বাবা-মা ছিলো অনেক বেশি সাপোর্টিভ আমাদের দুই ভাইয়ের ক্ষেত্রে। আমার অনেক কাজিনরাও ওনাদেরকে বুঝিয়েছে এই জগৎ টা অদূর ভবিষ্যতের জন্য খুব ভালো, একমাত্র মেঝ মামা হোটেল ইন্ডাস্ট্রির সাথে জড়িত, আমার মায়ের ফ্যামিলির মধ্যে। উনিও বাবা-মা কে বুঝিয়েছেন,সে যে ডিসিশন নিয়েছেন তা করতে দাও,খারাপ ডিসিশন নেয় নি,তার ক্যারিয়ারের জন্য ভালো হবে। সবার থেকে শোনার পর অবশেষে ওনারা ফাইনালি রাজি হলো,কারণ এই জগৎ সম্পর্কে ওনারা আগে অবগত ছিলেন না, এইখানেও যে সুন্দর ক্যারিয়ার গড়া যায়। ওনাদের জন্য ক্যারিয়ার হলেও আমার জন্য ছিলো এর চাইতেও বেশি কিছু।

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি অনেক বেশি নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম, এতদিন মোবাইলে বিভিন্ন ভিডিওতে এই ভবন টা দেখতাম,আজকে আমি তার সামনে দাঁড়িয়ে। অনেক গুলো ছেলে-মেয়েদের দেখতে পেলাম শেফ কোর্ট পরা,হয়তো ক্লাস শেষে বের হচ্ছে, কেউ আড্ডা দিচ্ছে ,কেউ অপেক্ষা করছে। আমার শেফ কোর্ট টা দেখে কিছুটা ভয় লাগা কমে একধরণের আনন্দ লাগা শুরু হলো,আল্লাহর নাম নিয়ে ভিতরে ঢুকলাম এবং ভর্তি পরীক্ষার যাবতীয় সকল কার্যক্রম শেষ করে এডমিট কার্ড নিয়ে যখন বাসায় ফিরছিলাম তখন একটা কথা মাথায় ঢুকে গেল, এই জার্নিটা একলাই আমাকে শেষ করতে হবে, এবং সবাইকে দেখাতে হবে আমি পারি এবং পারবো। অবশেষে ঠিক করলাম ন্যাশনাল হোটেল এন্ড ট্যুরিজম ট্রেনিং ইন্সটিটিউটে ভর্তি হবো এক বছরের প্রফেশনাল শেফ কোর্সে। বাবা কে নিয়ে ঢাকায় আসি ওনাকে ডাক্তার দেখাবো সেই সাথে আমিও ভর্তি হওয়ার জন্য ফর্ম কিনবো। আমি একা ছিলাম, মোবাইলের মাধ্যমে লোকেশন দেখে, মানুষজন কে জিজ্ঞাসা করতে করতে ইন্সটিটিউট টা খুজে পাই।

প্রথম যখন দূর থেকে ইন্সটিটিউটের ভবন টা দেখলাম এবং ইন্সটিটিউটের নাম লেখা সাইন বোর্ডটা, তখন আমি হঠাৎ দাঁড়িয়ে যাই ভয় লাগা শুরু করলো আবার একধরনের আনন্দ লাগাও। ভর্তি পরীক্ষার দিন, এডমিট নিয়ে যখন দ্বিতীয়বারের মতো ইন্সটিটিউট এ যাই তখন আমি আরো বেশি ঘাবড়িয়ে যাই, এত এত ছেলে মেয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে এসেছে দেখে। নেবে কয়জন, চান্স পাবো কিনা আরো কত কি। পরীক্ষার প্রশ্ন দেখে কিছুটা শান্তি লাগে, সব ইংরেজিতে লেখা থাকলেও আমার জন্য ওই প্রশ্ন গুলোর আনসার দেওয়াটা খুব কঠিন ছিলো না। আগের সেই ছোট্ট অভিজ্ঞতা টাই অনেক কাজে দিয়েছে প্রশ্ন গুলোর উত্তর লেখার জন্য। এরপর ভাইবা হলো এক এক করে, ঘন্টা খানেক এর মধ্যে রেজাল্টও পাবলিশ করে দেবে তাই ইন্সটিটিউট এ বসে অপেক্ষা করছিলাম। অবশেষে সেই সময়টুকু এসেছে সবাই রেজাল্ট দেখার জন্য হুড়োহুড়ি করছিলো। আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে নিজের নাম টা দেখে চোখ দিয়ে পানি টল টল করছিলো, ইচ্ছা করছিলো অনেক জোরে চিৎকার দিয়ে উঠি। নিজেকে কিছুটা স্বাভাবিক করার পর বাসায় জানালাম,সবাইকে ওইভাবে খুব একটা খুশি দেখলাম না। যদি কোন বোর্ড পরীক্ষায় গোল্ডেন প্লাস কিংবা বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতাম তাহলে হয়তো অনেক খুশি হতো, কিন্তু আমি ছিলাম ওইরকম খুশি। একমাত্র আমার মতোই কেউ ওই অনুভূতি টা অনুভব করতে পারবে।

২০২০ এর ডিসেম্বরে ইন্সটিটিউটের সকল ফর্মালিটি শেষ করি। ক্লাস শুরু হবে ২০২১ এর জানুয়ারীর ৭ তারিখ থেকে। প্রথম দিন ক্লাস অনেক গুলো নতুন নতুন অপরিচিত মুখ, নার্ভাস ছিলাম। আমাদের ডিপার্টমেন্ট হেড জাহিদা ম্যাডাম এসেছিলেন, ওনার অনেক গুলো ভিডিও দেখেছিলাম আগে, বিভিন্ন রান্নার অনুষ্টানেও দেখেছিলাম ওনাকে, ভর্তি পরীক্ষার সময় ও ওনাকে দেখেছিলাম কিন্তু এই প্রথম ওনাকে এতো কাছ থেকে দেখলাম অনেক এক্সাইটেড হয়ে ওনার কথা গুলো শুনলাম, সবার সাথে পরিচয় পর্ব শেষ হলো, ডিপার্টমেন্টের অন্যান্য টিচারদের সাথেও পরিচয় করিয়ে দিলো, রুটিন দিলো, ইন্সটিটিউট ভিজিট ছিল। আমি অনেক বেশি মুখিয়ে ছিলাম আমাদের প্র‍্যাক্টিক্যাল ক্লাস রুম টা দেখার জন্য, প্রথম যখন ঢুকলাম ওইটাই ছিলো আমার জীবনে প্রথম কোন প্রফেশনাল কিচেনে ঢুকা এটা এক অন্যরকম ভালোবাসা।

 

এইভাবে আস্তে আস্তে থিউরি ক্লাসও শুরু হলো, আমি খেয়াল করলাম আমি খুব উপভোগ করছি ক্লাস গুলো, আমার খুব ভালো লাগতছিলো যা এতবছর পড়াশোনার সময় একটুও কাজ করেনি। রান্নার সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য জানা শুরু করলাম, যা এতদিন করতাম কোনটার কি নাম, কোন কাটিং টার কি নাম, কুকিং মেথড এইসব কিছু মা কে করতে দেখেছিলাম, নিজে করতাম কিন্তু নাম জানতাম না। রান্না সম্পর্কে এত বৃহৎ পড়াশোনাও আছে তাও জানতাম না। প্রতিদিনই নতুন নতুন অনেক কিছু শিখতাম, জানতাম। আস্তে আস্তে নিজের ভিতর রান্নার প্রতি ভালোবাসা, ইচ্ছা, শখ গুলো আমার প্যাশন এ পরিনত হয়ে গেল কখন তা বলতেই পারবো না। আমি অনুভব করতাম ক্লাস গুলোতে মাদার সস, ফুডের ক্লাসিফিকেশন গুলো, নাইফ স্কিল কিংবা , ফুডের টেম্পারেচার সহ আরো কত কি না প্রতিনিয়ত শিখতে থাকলাম। একটা কিচেনের ভিতরেও যে অনেক গুলো সেকশন আছে ,একটা কিচেন ব্রিগেড আছে, কিচেনের ভিতর কমিউনিকেশন, সার্ভিস সম্পর্কে জানা আরো কত কি ,সে সাথে আমাদের ইংরেজিতেও ক্লাস হতো, কিচেনে কমিউনিকেশন সম্পর্কে প্রতিদিন আমাদের সবার সামনে ডায়ালগ গুলো বলতে হতো ইংরেজিতে। একদিন হঠাৎ আমাদের শেফ কোর্ট এর মাপ নিতে আসে,সেদিন থেকে আমার এক্সাইটমেন্ট আরো বেশি বেড়ে গেছিলো, প্রায় দুই কি তিন মাস আমাদের থিউরিও প্রায় শেষের দিকে আমরা প্র‍্যাক্টিক্যাল ক্লাসের দিকে যাব সব কিছু মিলিয়ে অনেক আগ্রহের সাথে অপেক্ষা। অবশেষে নিজের জীবনের প্রথম শেফ কোর্ট, এপ্রোন, শেফ হেড ক্যাপ হাতে পাই। খুব যত্ন সহকারে নিয়ে ক্লাস শেষ করে বাসায় এসেই ফ্রেশ হয়ে ট্রায়াল করা শুরু করলাম। এতদিন টিভিতে, ইউটিউবে শেফ কোর্ট পরা শেফদের দেখতাম, আজ নিজেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে লাগলাম। বাসার সবাই মজা করে বলছিলো এবার একদম বাবুর্চির মতো লাগছে। পরের দিন থেকে প্র‍্যাক্টিক্যাল ক্লাস শুরু এতোদিন আমরা যা থিউরি পড়েছি তা এখন প্র‍্যাক্টিক্যাল করবো। আলু, গাজর, শসা পিল করা থেকে শুরু করে কাটিং করার মাধ্যমে আমরা প্র‍্যাক্টিক্যাল ক্লাস শুরু করি।

এরপর কুকিং মেথড এর মাধ্যমে, মাদার সস গুলা দিয়ে ইন্টারন্যাশনাল সব কুইজিন এর ফেমাস ফুড গুলো দিয়ে, ফুডের টেষ্ট সম্পর্কে অবগত হয়ে আমরা ঢুকে পরি প্র‍্যাক্টিক্যাল কিচেনের রান্নার জগতে। আমি থিউরি থেকে শুরু করে, প্র‍্যাক্টিক্যাল ক্লাসের সব নোট করা শুরু করি। ইভেন প্র‍্যাক্টিক্যাল ক্লাসের কোনটার পর কোনটা দিচ্ছে, কতক্ষণ সময় নিচ্ছে, কোন মেথডের মাধ্যমে করছে, কিভাবে প্লেটিং করছে, কোন ফুড গুলোর সাথে কি কি গার্নিসিং করছে একদম সব যা আমাদের টিচাররা করে দেখাচ্ছে। অনেক বেশি পরিমাণে মনোযোগী ছিলাম, ক্লাস একটা দিন ও মিস করতাম না, টাইমলি চলা ফেরা করতাম। রান্নার প্রতি আগ্রহ, ভালোবাসা দেখেই হয়তো সবার মাঝ থেকে স্যার-ম্যাডামদের এমন কি আমাদের ডিপার্টমেন্ট হেড জাহিদা ম্যাডামের ও প্রিয় ছাত্রে পরিনত হই। সেই সাথে বন্ধুদের মাঝেও ছিলাম প্রিয়। ম্যাডামের সুনজরে থাকার কারণে প্র‍্যাক্টিক্যাল ক্লাসে ওনার সাথেও হেল্প করার সুযোগ পাই,প্র থম দিকে নার্ভাস থাকলেও আস্তে আস্তে তা সেরে উঠে। উনি সব সময় আমাদের সবাইকে মোটিভেট করতেন, স্বপ্ন দেখতেন শিখিয়ে দিতেন। আমি ওনার কথা গুলোর পাশাপাশি আমাদের সকল শিক্ষকদের কথা গুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতাম এবং আস্তে আস্তে নিজের মধ্যে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন বুনতে শুরু করলাম।

আমাদের কে যা বানানো শিখাতেন তা আবার গ্রুপের মাধ্যমে আমাদের তৈরি করতে দিতেন,কোথায় কি ভুল ছিল তা ধরিয়ে দিতেন,আমরাও নোট করা শুরু করতাম। আমার নোট খাতাটয় ছিল প্রবল আগ্রহ, ইচ্ছাশক্তি, কল্পনা শক্তি, যা তখন আমার মেইন শক্তির জায়গা। আর তাই গ্রুপেও আমাকে নিয়ে কাড়াকাড়ি হতো এক প্রকার। আমি এনজয় করতাম অনেক আমার সেই সময় গুলো (একজন ভলেন্টিয়ার হবার সৌভাগ্য, স্কুল জীবন থেকে রেড ক্রিসেন্ট এর দলনেতা হবার সৌভাগ্য এবং নিজের বিদ্যালয় কে দুইবার বেস্ট স্কুল এওয়ার্ড এনে দেওয়া, বিভিন্ন ট্রেনিং, ক্যাম্প ইত্যাদি অংশগ্রহণ করা কিংবা নিজ জেলায় দায়িত্বশীল জায়গায় থেকে মানবতার জন্য কাজ করা, বিভিন্ন জেলায় গিয়ে ট্রেনিং করা, ক্যাম্প করা কিংবা নিজ জেলায় বিভিন্ন স্কুলে, ইউনিটে ট্রেনিং করানোর কারণে আমি ছিলাম অন্যদের থেকে কিছুটা এগিয়ে, যা আমি আমার নিজের প্র‍্যাক্টিক্যাল লাইফে এসে বুঝতে পারি। যার জন্য আমি খুব অল্পতেই সবার ভরসার জায়গায়, নিজের সততা এবং পরিশ্রম দিয়ে জায়গা করে নেই। বিভিন্ন দূর্যোগে নিজের জীবনের কথা চিন্তা না করে মানুষের কথা ভেবে ত্রাণ কিংবা জরুরি জিনিস পত্র নিয়ে ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকান্ড, কোভিড এর মতো বড় বড় দূর্যোগে মানুষের কাছে গিয়ে কাজ করার সুযোগ পাই, যার জন্য মানুষের অনুভূতি গুলো অনুভব করা, টিম পরিচালনা করা, টিম কে মোটিভেট করা, সামনের দিকে এগিয়ে চলা এই সব কিছু আমার মধ্যে গড়ে উঠে সেই ২০১২ থেকে আস্তে আস্তে যখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি)।

 

এভাবে চলতে থাকে আরো কিছুদিন, এরপর হঠাৎ আমার ডিগ্রী ফাইনাল ইয়ারের রুটিন প্রকাশ করে। আবার কয়েকমাস পর ইন্সটিটিউটেও মিড শুরু হবে থিউরির উপর। প্রথম দিকে সিদ্ধান্ত নেই, পড়াশোনা আর করবো না। ফুল ফোকাস কুলিনারি পড়াশোনার মধ্যে দিব। কিন্তু বাসার কেউ রাজি না,আমিও তাদের কে রাজি করাতে পারলাম না। কারণ আমি ক্লাস মিস করি না, আবার ঢাকা থেকে নোয়াখালী গিয়ে পরীক্ষা দিব আবার ঢাকা আসবো এগুলা চিন্তা করতেই কেমন জানি লাগতো। ফাইনাল ইয়ারে এসে ড্রপ দিব কিনা তাও মাথার ভিতর ঘুরপাক করতো। আবার পরীক্ষা যদি দেই তাহলে পড়বো কখন। এসব চিন্তা করতে করতে পরীক্ষার সময় ও চলে আসলো। বাবা-মার আবদার ফেলতে পারবোনা,তাই ঠিক করলাম আচ্ছা পরীক্ষা দিব। এরমধ্যে আমাদের ইন্সটিটিউটের ও পরীক্ষার রুটিন দিয়ে দিল, ভাগ্য ভালো আমার জেনারেল পরীক্ষার মধ্যে কোন পরীক্ষা পরে নাই কিন্তু ১ দিন আগে কিংবা ১ দিন পরে পরেছে। আগের দিন নোয়াখালী গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে, আবার সেই রাতে ঢাকায় এসে ইন্সটিটিউটে পরীক্ষা দেওয়া শুরু করলাম। ওই একটা মাস নিজেকে চেনাও যাচ্ছিলো না। সে দিন গুলোর কথা মনে করলেই শরীর শিরশির করে উঠে। এভাবে নোয়াখালী ঢাকা, ঢাকা নোয়াখালী পরীক্ষা দিয়ে শেষ করলাম।

 

প্রথমে আমি প্রফেশনাল শেফ কোর্সে ভর্তি হয়েছিলাম, যেখানে সাপ্তাহে ৩ দিন ক্লাস হতো। মিড পরীক্ষার পর কয়েকজন প্রাক্তন ছাত্র ভাইয়াদের সাথে কথা হয় ওনারা সার্টিফিকেট নেওয়ার জন্য এসেছিলো। তখন ওনারা বললো তুমি যদি বাইরে যেতে চাও পড়াশোনা কিংবা জব করতে তাহলে ডিপ্লোমা করলে ভালো হতো, কারণ ডিপ্লোমার সার্টিফিকেট এর মূল্যায়ন করে অনেক বেশি। আমিও বললাম ভাইয়া শুরুর দিকে তো আমি বুঝি নাই, আমি ভেবেছিলাম শেফ কোর্স টাই নাকি বেস্ট, সেজন্য ভর্তি হই৷ এরপর কিছু ঘাটাঘাটি শুরু করি, দেখলাম কুলিনারি আর্টস নিয়ে বৃহৎ পড়াশোনা আছে কিন্তু প্রফেশনাল শেফ কোর্স নিয়ে তেমন নেই।

আমার ক্লাসে আমি সহ আরো কয়েকজন মিলে আমরা স্যার-ম্যাডামদের সাথে কথা বলি, ওনারাও বললো কিছু Advantage পাবা বেশি। এরপর সবাই মিলে আরো খোঁজ খবর নিয়ে দেখলআম ডিপ্লোমা করলে বেস্ট হবে। আমার ফ্যামিলিতে আমি ছাড়া কালিনারি জগতে আর কোন ভাই -বোন কিংবা আত্নীয় স্বজন নেই, কিংবা পরিচিত ও কোন মানুষ ছিলো না যে সাজেশন নেব কি করবো।

আমি জানতাম এই জার্নি টা আমার একার হবে শুরু থেকে, তাই সবসময় বলতাম মন যা চাইবে সেই সিদ্ধান্ত নেব। বাবা- মা কে বলার পর ওনারা বললো আমরা তো এই লাইনে তেমন কিছু জানি না, তোমার ক্যারিয়ারের জন্য যা ভালো হবে তাই করো। আমরা ডিপার্টমেন্ট হেড এর সাথে কথা বলে সেকেন্ড সেমিস্টার ফি দেওয়ার সময় ট্রান্সফার হয়ে ডিপ্লোমাতে চলে যাই কয়েকজন। বাড়তি আরো ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। 

 

কিন্তু এখন এই মুহুর্তে এসে মনে হচ্ছে ভুল করেছিলাম হয়তো, এক্সপেরিয়েন্স ছাড়া কোন মূল্য নেই। কেউ দেখেও না কিংবা মূল্যায়ন ও করে না পড়াশোনা বাংলাদেশে। যাইহোক আরো নতুন কিছু শিখবো বলে এক্সাইটেড ছিলাম, সেই সাথে প্রথম ছয় মাস যাদের সাথে ছিলাম তাদের কে ছেড়ে আরেকটা ডিপার্টমেন্টে চলে যাচ্ছি মন খারাপও ছিলো কিছুটা। ডিপ্লোমাতে সপ্তাহে শুধু দুইদিন ক্লাস, শুক্রবার আর শনিবার। যেদিন প্রথম ডিপ্লোমাতে ক্লাস করি সেদিন দেখলাম তারা আমাদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে ছিল, আমরা যে ক্লাস গুলো আরো ১ মাস আগে শেষ করেছি তারা সেগুলো শুরু করলো মাত্র। কি পরিমাণ সিন্ধান্ত হীনতার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম তখন।

তখন মনে হচ্ছিলো কি করলাম,কেন করলাম। এখন যেহেতু পিছনে ফেরার রাস্তা আর নেই, রিক্যাপ করা শুরু করলাম। তবে খেয়াল করলাম তাদের কে আরেকটু ডিটেইলস বলতো। এভাবে কয়েক সপ্তাহ গেল। সাপ্তাহে যেহেতু দুইদিন ক্লাস সেহেতু বাসায় বসে না থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি জব করতে পারলে বেস্ট হবে মনে করলাম৷ একটা সিভি বানাই, এরপর শান্তিনগর, ধানমন্ডি, বসুন্ধরা বিভিন্ন জায়গায় নিজে গিয়ে গিয়ে সিভি জমা দিয়ে আসতাম একটা জব পাওয়ার জন্য। কেউ সিভি গুলো রাখতো, কেউ রাখতো না। প্রায় মানুষের কাছ থেকে শুনতাম আমাদের লোক লাগবে না, যাদের লাগতো তাদের এক্সপেরিয়েন্স ওয়ালা লোক লাগবে। আমিতো এখনো শেষই করতে পারি নাই পড়াশোনা আবার কোন এক্সপেরিয়েন্স ও নাই৷ প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরনের নতুন নতুন অভিজ্ঞতা হতো৷ অনলাইনে ও ফেসবুকের মাধ্যমে আবেদন করতাম। একদিন হঠাৎ বনানী একটা হোটেল থেকে ফোন আসে, যেখানে আমি অনলাইনে আবেদন করেছিলাম। ওনারা বলে আপনার একটা সিভি আমরা পেয়েছি অনলাইনের মাধ্যমে ,অমুক তারিখে ইন্টারভিউ দিতে আসতে পারবেন। আমি তো ভীষণ খুশি রাজি হয়ে যাই। মনে মনে লাফাতে থাকি। ইন্টারভিউ দিন অনেক খোঁজখুঁজি করে হোটেল টা পেয়ে যাই। ১ ঘন্টা আগেই পৌঁছে গিয়েছিলাম৷ হোটেলের সামনে এসে গুনলাম এক দুই করে কয়তালা, মোট ১৬ তালা ভবন। আমি তো ভীষণ নার্ভাস এবং এক্সাইটেড ছিলাম জীবনের প্রথম ইন্টারভিউ। ভিতরে গিয়ে সিভি জমা দিয়ে বসলাম। বললো একজন আসবে আপনি অপেক্ষা করেন তারপর আপনার ইন্টারভিউ হবে।

আমিও অপেক্ষা করতে থাকলাম, আমার সাথে আরেকজন মানুষ এসে বসলো। বুঝতে পারি উনিও ইন্টারভিউ দিতে আসছে। নার্ভাসনেস টা কিছুটা কমানোর জন্য ওনার সাথে পরিচিত হলাম, কথায় বুঝলাম উনি হেড শেফ এর পজিশনে এসেছেন ইন্টারভিউ দিতে। আমার সম্পর্কেও বললাম ওনাকে। এরমধ্যে একজন আসলো। আমাদের দুইজনের সামনে বসেই প্রথমে আমার সিভিটা নিলো, আমার সম্পর্কে জানতে চাইলো। আমিও বললাম সুন্দর ভাবে,এরপর বললো আপনার যেহেতু কোন অভিজ্ঞতা নেই সেহেতু আমরা আপনাকে ইন্টার্ন হিসাবে ৩ মাসের জন্য নিতে পারি, আপনাকে কিছু সম্মানী দেওয়া হবে এরপর কাজ দেখে আপনাকে হয়তো আমরা রেখেও দিতে পারি৷ রাজি থাকলে এখনই কনফার্ম করে বলেন সময় কম। আমিও এতো চিন্তা না করে রাজি হয়ে যাই, কারণ ওনার কথা শোনার পর খুশিতে আত্মহারা আমি মনে মনে। এতো বড় একটা হোটেলে ইন্টার্নি তাও আবার শেষ করার আগে ভাবতেই নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছিলো।আগামীকাল ১০ টায় জয়েন করতে বললো আমিও রাজি হয়ে যাই সময় নষ্ট করতে চাচ্ছিলাম না। বের হয়ে বাবা-মা কে ফোন করি, ওনারাও অনেক খুশি। বাসায় এসে সেই ধরনের এক্সাইটমেন্ট। পরের দিন সময় মতো জয়েন করলাম।

 

এরপরের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমি ১৯ আগস্ট ২০২১ সালে ফেসবুকে একটা পোস্ট করি, সে পোস্ট টা কপি করে নিচে দিলাম –
জীবনের প্রথম জার্নি টা খুব একটা ভালো শুরু হলো না।

৩ দিনের মাথায় ইন্টার্নশিপ ছাড়তে হলো। কারণ এই জায়গায় কাজ করলে প্রাতিষ্ঠানিক যে শিক্ষা এতদিন গ্রহন করলাম, সব ধুলা মাটি হয়ে উড়ে যাবে।
খুবই exited ছিলাম প্রথম দিন, দূর থেকে এত সুন্দর কিচেন এর লাইন আপ দেখার পর আরো বেশি খুশি হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু মন ভাঙ্গা শুরু হলো কাছে গিয়ে, সব কিছুই চূড়ান্ত পর্যায়ে নোংরা, তেলাপোকার মত দেখতে একপ্রকার কয়েক হাজার প্রাণীর অবাধ বিচরণ। চারপাশ দেখে মনে হচ্ছে তাদের আপ্যায়ন এর জন্য প্রচুর ময়লা, খোসা সহ প্রচুর নোংরা ফেলে রাখা হয়েছে।

এত কিছুর মধ্যে আবার খেয়াল করলাম,সকল ধরনের মসলার খোলা বাটির মধ্যে কোন ঢাকনা নেই, সব গুলা সস এর বোতল খোলা। তখন মনে হচ্ছিলো এই আমি কোথায় আসলাম। উপরে ফিটফাট ভিতরে সর্বনাশ না শুধু মহা সর্বনাশ। আর মনে মনে ভাবছিলাম এতদিন যত রেস্টুরেন্টে গিয়ে খেয়েছিলাম তাদের ও কি সেইম অবস্থা ছিল, ভেবেই শরীর ঘিন ঘিন করছে। যাই হোক সব কিছু মেনে নিলাম, অনেক দিন এই কিচেনে হয়তো ভালো কাজ হয় না, তাই এই অবস্থা। নতুন করে ওনারা একটা টিম রেডি করলো, কিন্তু কারোই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, কিন্তু ছিলো অনেক অভিজ্ঞতা। ভাবলাম,সেই অভিজ্ঞতা থেকেই কিছু জ্ঞান অর্জন করে নেবো। জানতে পারলাম আগে কিচেন এর স্টাফ সহ শেফ সবাই ভাগছে এইখান থেকে, ২/৩জন ভালো শেফ এসে কিচেন এর অবস্থা দেখে পরেরদিন থেকেই আর আসলো না। আর এখন যারা আছে, তাদেরও হাইজিন এর উপর কোন মাথা ব্যাথা নেই। যে চপিং বোর্ডে মাছ কাটতেছে, সেই বোর্ডে আবার ভেজিটেবল আবার সেই নাইফ আর বোর্ডের মধ্যে পোল্ট্রি আইটেম। দেখার পর সাথে সাথে মানা করলাম, সব কিছুর জন্য আলাদা আলাদা স্টেশন এবং নাইফ দিয়ে নিজের মত করে কিচেন গোছানো আর পরিষ্কার করা শুরু করলাম। ৩ দিনের মধ্যে কিচেন এর পরিবেশ ৬০% চেঞ্জ করলাম, নিজের ইন্সটিটিউট থেকে আরো ২জন কে ইন্টার্নশিপ এরজন্য ডেকে নিয়ে ১ দিনে পুরো কিচেন চকচকা করলাম, শুধু মাত্র পেস্ট কন্ট্রোল ছাড়া। কারণ ওইটা তো আর আমাদের দ্বারা সম্ভব না, এটার জন্য আলাদা ইউনিট আছে। কিন্তু যে লাউ সেই কধু, আমাদের তিন জনের একার চেষ্টায় তো আর হবে না,পুরা টিম এর চেষ্টা থাকতে হবে হাইজিন মেইনটেইন এর। স্টেশন ভাগ করার পরও তারা একটা স্টেশনে এই সব কাজ করে, ইভেন নিজেদের স্টাফ ফুড পর্যন্ত খুব ই বাজে আনহাইজেনিক ভাবে রেডি করে। আর ফ্রিজের অবস্থা নাই বললাম, প্রচুর পরিমানে ফুডে Cross contamination হয়। যারা আছে কেউই Personal Hygiene মেইনটেইন করে না। তারপর ও হাল ছাড়িনি, নিজে চেষ্টা করেছিলাম সব কিছু বদলানোর, ওনারা জানে না হয়তো সেইজন্যই এমন। কিন্তু দেখলাম যার অভ্যাস যেটা সেটা পরিবর্তন করা বেশ কঠিন। সারাদিনে ফুডের অর্ডার আসে খুব কম, বার রেস্টুরেন্ট মাঝেমধ্যে কিছু ফুড আসে আর হোটেল এর এমডির কিছু ফুড আসে৷ তাদের ফুড গুলা পর্যন্ত যা তা ভাবে বানিয়ে সার্ভিস করা হয়। মজার বিষয় হলো, সার্ভিস করা ফুড থেকে ময়লা হাত দিয়ে ওয়েটার, শেফ, স্টাফ সবাই খাবার একটু একটু টেষ্ট ও করে। এমডি তো আর জানে না, ওনাকে যে প্লেটে ফুড সার্ভ করা হয় সেগুলার উপর ঘুরাঘুরি করে তেলাপোকা। ইভেন মসলা, সর্ সব কিছুর উপরে হাটে। কারো কোন মাথা ব্যাথা পর্যন্ত নেই। আর ফ্রিজে অবস্থা, কাচা মাছ মাংস আর মেরিনেট করা জিনিস সব একসাথে। বাসি রুটি, মেও,বা টার সব ম্যাজিক করে বানিয়ে প্লেটের উপর ফয়েল পেপার দিয়ে সার্ভিস করা হয়। বুঝতেই পারবেন না এইটা এমন এক কিচেন থেকে আসা যেখানে একবার কেও ঢুকলে আর বাপের জীবনে রেস্টুরেন্টে বসে খাবার খাওয়ার চিন্তাও করবে না। আমি চিন্তা করি এরা এখনো বেঁচে আছে কিভাবে ভাই?

যাই হোক,আমি হাল ছাড়িনি। তবে এইখান থেকে ছাড়তে হয়েছে, কারণ এইখানে শেখার কিছু নেই, আর যারা আছে তাদের শেখার এবং পরিবর্তন এর আগ্রহ নেই। উল্টো এটা আমার ক্যারিয়ার নষ্ট করে দেবে। আমার কাছে ফুড সেফটি এবং হাইজিন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যেটা আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। তবে একটা ভালো অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলাম জীবনের শুরুতে। আরো অনেক কথা বলার ছিলো লিখতে ঘেন্না হচ্ছে তাই লিখলাম না।
সবাই অনেক Congratulations সহ অনেক দোয়াও করেছিলো আমার এই শুরু টা দেখে, আপনাদের সাপোর্ট আমাকে অনেক বেশি অনুপ্রেরণা দেয়। আশা করছি খুব শীঘ্রই নতুন কিছুর সন্ধান পেয়ে যাবো, আর অবশ্যই আপনাদের জানাবো এবং ওই রেস্টুরেন্ট কিংবা হোটেল যাইহোক সবাইকে আমার গেস্ট হিসাবে রিসিভ করবো।

Stay Safe everyone

 

আমি হাল ছাড়িনি আবার এ্যাপ্লাই করা শুরু করলাম। ওই সাপ্তাহে ক্লাসে ম্যাডাম হঠাৎ বললো বনানীতে অথেনটিক কাবাব হাউজে কিছু লোক নেবে। কেউ যদি কাজ করতে চাও তাহলে ক্লাস শেষ করে সিভি নিয়ে যেও ইন্টারভিউ নেবে। আমরাও দুইএকজন সিদ্ধান্ত নিলাম যাব, কাবাব আইটেম শিখতে পারবো। ওনাদের মেনুতে প্রায় ১৫/২০ আইটেম এর কাবাব ছিলো, আমরা এটলিস্ট ওইগুলো শিখতে পারবো আরো কত কি আলোচনা করতছিলাম।

সিভি বের করে গিয়ে দেখি আমাদের ক্লাসের সহ আরো কয়েক শিফটে প্রায় ১৫/১৬ জন আসছে ছেলে-মেয়ে। এতো মানুষ দেখে ওনারাও কিছুটা অবাক হয়ে যায়। আর সেই সাথে আমরাও। ঠিক দুপুরের খাওয়ার টাইম ছিলো তখন আমাদের প্রায় সবাই ক্লাস শেষ করে গিয়েছিল। ওনারা আমাদের জন্য দুপুরের লাঞ্চের ব্যবস্থা করলো। আমরা সবাই অবাক,এতো মানুষদের খাওয়াবে। আমাদের কে ফ্রেশ হয়ে বসতে বললো। আমরা মজা করে বলতেছিলাম যাক ফ্রিতে কাবাব খেয়ে যেতে পারবো এটলিস্ট। পরে দেখলাম বাইরের থেকে ডিম পোলাও এনে খেতে দিছে। সবাই কিছুটা হতাশ কিন্তু মনে মনে খুশি।

খাওয়া দাওয়ার শেষ করে ওনারা বললো আপনারা অনেকেই শেফ কোর্ট পরে এসেছেন, আপনারা কি সার্ভিসে কাজ করতে আগ্রহী সবাই। আমরা অবাক হলাম সবাই, একজন একজনের দিকে তাকিয়ে হা করে থাকলো। পরে আমরা বললাম আমরা এসেছি কিচেনে কাজ করার জন্য, এবার ওনারাও হা করে থাকলো।

এরপর কিছুক্ষণ কথা বলার পর বুঝতে পারলো দুইপক্ষের ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে কমিউনিকেশনে।

 তারপরও ওনারা বললো আচ্ছা আপনারা কেও যদি সার্ভিসে কাজ করতে চান তাহলে বসেন আমরা এক এক করে ইন্টারভিউ নেব। অনেকেই চলে গেছে কিন্তু আমরা কয়েকজন থেকে গেলাম, ভাবলাম সার্ভিস হলেও থাকি, পড়াশোনার পাশাপাশি একটা জব করি। একে একে সবাই ইন্টারভিউ দিতে থাকলো। আমাদের সার্ভিসের ক্লাস শেষ হয়েছে। প্র‍্যাক্টিক্যাল অভিজ্ঞতা না থাকলেও ওই যে ক্লাসে কিভাবে সার্ভিস করা হয়, সার্ভিসের সিকুয়েন্স কি কি এগুলা সম্পর্কে জানতাম আমরা, আর ক্লাসে অল্প একটু প্র‍্যাক্টিক্যাল ও হয়েছে কিভাবে প্লেট হ্যান্ডেল করতে হয় সহ আরো অনেক কিছু। একসাথে ২জন ৩ জন করে ইন্টারভিউ নিচ্ছিলো আর সবাইকে একই প্রশ্ন করছিলো বাসা কোথায়? ওনাদের ক্লোজিং করতে করতে ১ টার ও বেশি সময় হয়ে যায়। যাদের বাসা বনানীর আশেপাশে শুধু তাদেরকে জব অফার করছিলো।

আমার বাসা ছিল অনেক দূরে বনানী থেকে, ওতো রাতে বাস পাবো না যাতায়াতের অসুবিধা হবে এইরকম বলে স্কিপ করতে চাচ্ছিলো। আমি ওনাদেরকে রাজি করানোর চেষ্টা করি অসুবিধা হবে না আমি ম্যানেজ করতে পারবো। কিন্তু রাজি হচ্ছিলো না বলে কথার সুরে বুঝতে পারি। কিন্তু আমার আগ্রহ দেখে ওনারা আমাকে অফার করে, মাঝেমধ্যে ওনাদের ওইখানে বড় ইভেন্ট হয়, তখন একদিনের জন্য কিছু সার্ভিসম্যান ওনারা নিয়ে থাকে, আমি চাইলে ওইখানে নাম দিতে পারি ওনারা ফোন করবে যেদিন যেদিন প্রয়োজন হবে। এট লিস্ট নাই মামা থেকে কানা মামা তো ভালো। এরপর প্রায় বিকাল, বের হয়ে আমরা তিনজন সিদ্ধান্ত নিলাম বনানী আর গুলশানে সিভি জমা দেব বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে। হাঁটতে হাঁটতে আমরা গুলশান পর্যন্ত চলে যাই। একটা রাফেনাতো ইতালিয়ান রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়ি, রেস্টুরেন্টের মালিক শেফ উনি বাংলাদেশি ইতালিয়ান বংশদ্ভূত। আমাদের কে দেখে প্রচন্ড খুশি হয়, যে আমরা পড়াশোনা শেষ করার আগেই জব এর জন্য গিয়ে গিয়ে বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে সিভি জমা দিচ্ছি। উনি আমাদের ওইদিনই ইন্টারভিউ নিলো ৩ জনের একসাথে, ফুড সম্পর্কে বিভিন্ন জিনিস জিজ্ঞাসা করলো, আমার সাথের দুইজন ওতো ইংরেজি বুঝে না, আমিও বুঝতাম না ভালো, তবে যতটুকু বুঝেছি ওতোটুকুর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছি। উনি বললো তোমাদেরকে ফোন দেব। আমরাও খুব খুশি হয়ে বের হলাম। তিন জনই নিশ্চিত ছিলাম আমাদের কে ফোন দেবে। এবার ফোনের অপেক্ষা, দুইদিন যাওয়ার পর ও আর ফোন আসলো না।

এরমধ্যে একদিন অথেনটিক কাবাব হাউজ থেকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞাসা করে আগামীকাল ফ্রি আছি কিনা? ওনাদের একটা বার্থডে ইভেন্ট হবে, সেখানে একদিনের জন্য সার্ভিসম্যান হিসাবে কাজ করতে হবে। ক্লাস যেহেতু নেই আমিও রাজি হয়ে গেলাম, নতুন একটা অভিজ্ঞতা হবে৷ রিপোর্টটিং সময় ছিলো ২টায় ইভেন্ট সন্ধ্যা থেকে শুরু হবে। যথারীতি সময়ে গিয়ে দেখি আমাদের ক্লাসের আরো দুইজন সহপাঠী ও এসেছে। লাঞ্চ বাসায় থেকে করে আসার জন্য বলেছিলো। আসার পর প্রথমে আমাদের ব্রিফিং হয়, কে কোথায় কিভাবে কাজ করবে। টেবিল সেটআপ কেমন হবে। কোন কোন খাবার যাবে মোটামুটি সব কিছু বুঝিয়ে দিয়ে টিম ভাগ করে দেওয়া হয়। এরপর ৫০ প্যাকেট টিস্যু আজকে ইভেন্ট এর জন্য ভাজ করাতে দেয় আমাদের তিনজন কে। ওই প্রথম রিয়েলাইজ করলাম এতোদিন রেস্টুরেন্টে গিয়ে কত টিস্যু নষ্ট করতাম অযথা, ওইদিন শপথ নিলাম আর কোনদিন অযথা টিস্যু নষ্ট করবো না। বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা লাইটিং সেটআপ এর পাশাপাশি টেবিল গুলো সেটআপ দেওয়া শেষ। আমাদের কে টি-শার্ট দিলো পরার জন্য, যেটা আবার কাজ শেষ করে ফেরত দিয়ে দিতে হবে। ইভেন্ট ছিলো একটা বার্থডের, ৬/৭ বছরের একটা মেয়ে বাবুর নাম টা সম্ভবত আয়েশা ছিলো মনে পড়ছে না ঠিক। আমি কিছুটা ভয়েও ছিলাম পরিচিত কোন মানুষজনের সামনে যেন না পরি, আল্লাহ আল্লাহ করছিলাম। আমার ফ্যামিলির কেউ আমাকে হয়তো এমন অবস্থায় দেখলে শক খাবে কিন্তু আমি প্রতিটা কাজকেই সম্মান করি এবং ভালোবাসি।  আমাদের কে চা আর বিস্কুট দিলো খাওয়ার জন্য সাথে একটা একটা করে স্যুভেনির হিসেবে মাস্ক দিলো।

 মাস্কটা পেয়ে খুশি লাগছিলো যাক এখন হয়তো কেউ চিনবেও না পরিচিত কেউ থাকলেও। আস্তে আস্তে গেস্টরা আর হোস্টরা সবাই আশা শুরু করলো। আমরাও ওয়েলকাম ড্রিংকস সার্ভ করা শুরু করলাম। আমি যে সেকশন টায় ছিলাম সেটা ছিলো একদম মেইন স্টেইজ এর পাশে ৫টা টেবিল, যেখানে মুরুব্বিদের বসার এবং খাওয়ার জায়গা ছিল। সাধারণত বয়স্ক মানুষদের ফুড সার্ভিস করাটা অনেক সেনসেটিভ হয়ে থাকে, কিন্তু আমি মেন্টালি একদম ফিট ছিলাম। ইভেন্টে সবাই কত মজা করছে, তখন নিজের বার্থডে সহ কতকিছুর কথা মনে পড়ছিলো। কত বার্থডে পার্টি সহ এইরকম ইভেন্ট গুলাতে গেয়েছিলাম, কখনো সার্ভিসম্যান কিংবা ওয়েটার যারা আছে তাদের কথা চিন্তা করি নাই। বরং কিছু উল্টাপাল্টা করলে সবাই বকা দিতো৷ এটা অন্যরকম একটা অভিজ্ঞতা, যা কেউ না করলে বুঝতেই পারবে না৷ যে যা চাচ্ছে সবার চাওয়া গুলো পূরণ করাই ছিলো আমাদের মেইন টার্গেট। এরপর খাওয়া শুরু হলো, আমার সাথে ব্যাকআপ হিসাবে আরেকজন দিলো ,দুইজন মিলেই ৪০/৫০জনের খাবার একসাথে সার্ভ করা শুরু করলাম, কিছু শেষ হলেই মূহুর্তের মধ্যে রিফিল করে দেওয়া। আমার সেকশন থেকে কিচেন টা ছিলো একটু দূরে আবার ওই রাস্তায় সবাই দাড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে, বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করছে, ফটোসেশান চলছে কত কত বাধা। আহ কিভাবে যে বুঝাই। কারো কোন ধমক না খেয়ে, দুইটা ব্যাচ শেষ করলাম।

কোন সময় যে রাতের ১১টা বেজে গেল খেয়ালই করি নাই। টেবিল ক্লিয়ার করা যে কি পরিমাণ কষ্ট কিংবা ওতো দূর থেকে ফুড আনা নেওয়া, প্লেটে সুন্দর মতো ফুড উঠিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে ছোট ছোট সব ডিটেইলস গুলো আমার মনে খুব সাড়া এবং নাড়া দুইটাই দিলো। ওয়েটারদের প্রতি অন্যরকম একটা শ্রদ্ধা চলে আসলো মনে মনে। কতই না কষ্ট করে তারা। আমাকে আবার আমার সেকশন শেষ করে নিচের ফ্লোরে আরেকটা ভি.আই.পি সেকশনে পাঠানো হলো, ওইটাও শেষ করলাম। এরপর আস্তে আস্তে সবাই চলে যাওয়া শুরু করলো, খুব খিদাও লাগছিলো। মনে মনে ভাবছিলাম ভালো করেই খাবো আজকে। আমাদের কে ডাকা হলো যেখানে স্টাফদের খাবার দিবে। আমাদের ৩ জনকে একদমই চেনা যাচ্ছিলো না এমন অবস্থা, সবার চেহারার মধ্যে ক্লান্তির ছাপ একদম দৃশ্যমান হয়ে ফুটে ছিলো৷ আবার তিনজনেরই ভিতরে ছিলো প্রশান্তি, সুন্দর ভাবে শেষ হয়েছে কোন কমপ্লেইন ছাড়া।যারা আমাদের কে কাজ বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তারাও খুব খুশি আমাদের নিয়ে। আমরা ফ্রেশ হয়ে প্লেট নিয়ে খাবার নিতে গেলাম, তিনজনই বলছিলাম আজকে একটা ভালো খাওয়া হবে কিন্তু গিয়ে দেখি স্টাফদের জন্য আলাদা রান্না সবজি, ডিম আর ভাত। কি যে খারাপ লাগছিলো। সন্ধ্যা থেকে এতো মজার মজার খাবার সার্ভ করলাম বুঝি আমাদের কে ওইগুলো কিছু খেতে দিবে না। পিছনের সিঁড়ির পাশে ছোট্ট একটা টেবিলে সবাই কোন ভাবে খাচ্ছে। আমরাও খাবার নিয়ে বসি, কিন্তু কোন ভাবেই গিলতে পারছিলাম খাবার গুলো। কোন ভাবে শেষ করে আমরা আবার উপরে গিয়ে বসি। তখন প্রায় ১২:৪৫ বাজে। ছোট্ট একটা ব্রিফিং হলো আবার, আমাদের কে একটা একটা খাম দিলো। কি যে ভালো লাগতেছিলো খাম টা পেয়ে। তখন সারাদিনের কষ্ট হঠাৎ গায়েব। নিচে গিয়ে দেখি ৫০০টাকার নোট। তখন প্রায় ১:৩০টা, ওতো রাতে বাস পাবো না তাই একটা পাঠাও নিয়ে বাসায় চলে আসি। ঘুমের মধ্যেও আমি ওইদিন সার্ভিসের স্বপ্ন দেখছিলাম। টাকার চাইতেও যে অভিজ্ঞতা হয়েছে ওইদিন আমার তা সারাজীবন মনে রাখার মতো। এভাবে আমাদের কয়েকদিন ওইদিনের গল্প করতে করতে চলে যায়।

আমাদের ফাইনাল এক্সামও শুরু হতে থাকে ইন্সটিটিউটের। মোট ১হাজার মার্কের পরীক্ষা হবে। থিউরি, প্র‍্যাক্টিক্যাল, গ্রুপ, পার্সোনাল এইভাবে অনেক গুলো ক্রাইটেরিয়া ভাগ করা আছে। আমরাও ফাইনাল প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা গুলোতে অংশগ্রহণ করা শুরু করি। এরমধ্যে আমাদের সাথের একজন বললো রামপুরা ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সাথে একটা রেস্টুরেন্টে লোক নেবে। ওর সাথে গিয়ে ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য, ওর এক পরিচিত বড় ভাইয়ের মাধ্যমে যাব। আমিও রাজি হয়ে গেলাম। ওইদিনই সিভি নিয়ে গেলাম আর বললো আগামীকাল সকাল ১০টা থেকে আসার জন্য। দুইদিন আমাদের কে অবজার্ভ করবে এরপর ফাইনাল করবে। আবার খুশি হয়ে গেলাম। পরেরদিন সকাল বেলা ক্লাস ছিল, আমরা দুইজনই জানিয়ে রেখেছিলাম আগে৷ ওনারা বললো ক্লাসের সময় সুযোগ দেবে সমস্যা নেই। পরে ক্লাস শেষ করে দুপুর নাগাদ গেলাম৷ কিচেনে নিয়ে গিয়ে পরিচয় করিয়ে দিলো দুইজনের সাথে যাদের বয়স আমাদের চাইতেও ৩/৪ বছরের কম। আমরা ভেবেছিলাম শেফরা হয়তো বাইরে গেছে কিংবা আজকে ছুটি। পরে ওই দুইজনের সাথে একসাথে আমরা দুইজন দুপুরের লাঞ্চ করতে বসলাম আর শুনলাম এইখানে ওরা দুইজন ছাড়া আর কেউ নেই। বাকিরা চলে গেছে। ওরাই রান্না করে, ডিশওয়াশিং করে এক কথায় সব করে। তারা ভেবেছিলো আমরা সিনিয়র শেফ হিসাবে জয়েন করেছি, পরে তারা বুঝতে পারে আমরা একদম নতুন তাদের এ্যাসিস্ট্যান্ট হিসাবে জয়েন করেছি। আমরাও তাদের কে রেস্পেক্ট এর মাধ্যমে কাজ করা শুরু করি। এই কিচেনের অবস্থাও সেইম আগের কিচেনের মতো ছিলো, আমার জয়েন করা প্রথম কিচেন টার মতো। আমরা সব কিছু বুঝে নি কোথায় কি আছে, কি কি মেনু আছে। তারাও আমাদের কে খুব সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে দেয়। একদিনের মধ্যে আমাদের সম্পর্ক টা অন্যরকম সুন্দর হয়ে যায়, যেহেতু আমাদের বয়স এর ডিফারেন্স বেশি ছিলো না। আমরা ছিলাম খুব ফ্রেন্ডলি আর যতটুকু পারি তাদের কে হেল্প করতাম। এভাবে দুইদিন চলে যাওয়ার পর আমাদের কে ফাইনাল করলো। কিন্তু আমরা সন্দিহান ছিলাম কারণ রেস্টুরেন্টের ভিতর গত অনেক সমস্যা ছিলো। যে দুইজন ছিলো তারা ২ মাসের বেতন পায় না, আটকিয়ে রেখেছে। তাদের কে বেতন দিলেই তারা চলে যাবে এইভেবে। কারণ বাকিরা সবাই চলে গেছে, তারাই ভরসা করে আমাদের কে সব কিছু খুলে বলেছে। আমরাও কনফিউজড হয়ে যাই কি হচ্ছে বার বার আমাদের সাথে। পরে বললাম যে কয়দিন আছি কাজ করি, তাদের কাছ থেকে কিছু শিখি। বাসায় বসে থাকার চেয়ে। মনে মনে আমি অনেক ভাঙতে শুরু করি। কারণ যেখানেই যাচ্ছি কোন না কোন সমস্যা লেগেই আছে। তারা আসলেই অনেক পরিশ্রম করতো, আমরাও কিচেনটাকে গোছানো শুরু করি। ওইখানের যিনি ম্যানেজার ছিলেন তিনি চরম লেভেলের চাপা বাজ, দুর্নীতীবাজ এবং সবার টাকা মেরে খাওয়া লোক।

তাকে প্রথমদিন অনেক জ্ঞানী লোক ভাবছিলাম, ওনার কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা, পরে আস্তে আস্তে বুঝতে পারলাম মালিকের চোখে ধুলো দিয়ে সে তার কৃতকর্ম করেই যাচ্ছে, এবং পুরাতন সকল কর্মীদের টাকা মেরে দিচ্ছে। এইভাবে চলছিলো রেস্টুরেন্টটা। আমরা ওই দুইজনকে বুঝাই আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে আমরা একটা টিম হিসাবে কাজ করবো, দরকার পরলে আরো ২ একজন কে নিয়ে সুন্দর ভাবে সাজাবো। কিন্তু তারা কোন ভাবেই রাজি হয় না। পরে বুঝলাম, ম্যানেজার এর কারণেই রেস্টুরেন্ট টার এই অবস্থা। সে কিচেনে এসে নিজের মতো করে মেনুর বাইরে ফুড বানিয়ে উল্টাপাল্টা জিনিস দিয়ে গেস্টদের ঠকায়, আর তাদের সাথে যা ইচ্ছে তাই ব্যবহার করে। সব কিছু মিলিয়ে এক সাপ্তাহ সহ্য করে পরে বুঝলাম এই জায়গায়ও কাজ করা যাবে না। আমরা চলে আসি, আমার সাথের জন যার মাধ্যমে আমরা যাই ওইখানে ওনাকে সব কিছু খুলে বলার পর উনি নিজেই আমাদের বলেছে ওইখানে যাওয়ার দরকার নেই আর উনি আমাদের জন্য অন্য কোথাও দেখবে। ওইখানে যে দুইজন ছিলো তারাও দুইদিন পর চলে যায় এক গাদা মনে কষ্ট নিয়ে। আমার পক্ষে যতটুকু সম্ভব তাদেরকে বুঝানোর ছিল তাদের কে বললাম। তাদের কাজের প্রতি আগ্রহ ভালোবাসা দুইটাই ছিল। তাদের কে উৎসাহিত করলাম একটা কোর্স করার জন্য, যেহেতু তাদের অভিজ্ঞতা আছে, একটা কোর্স করলে বাংলাদেশে ভালো কোন হোটেলে কিংবা রেস্টুরেন্টে জব করতে পারবে। আল্লাহ রহমতে একজন পর্যটন কর্পোরেশন থেকে কোর্স করে কয়দিন আগে দুবাই চলে যায়। সে যখন ম্যাসেজ দিয়ে বললো তার কথা তখন মন থেকে দোয়া আর অনেক ভালোবাসা চলে আসে তার জন্য। আল্লাহ সবার ইচ্ছা আর স্বপ্ন গুলো পূরণ করুক। আমি আমার চেষ্টা চালিই যাই, নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা সব কিছুই দিয়ে যাচ্ছিলাম।

Chillox থেকে একটা ফোন আসে, যেখানে অনলাইনে আবেদন করি। ওনারা বললো আগামীকাল সিভি নিয়ে ওনাদের অফিসে আসার জন্য। আমিও খুশি মনে গেলাম। গিয়ে দেখি কয়েকজন আসলো,তারা কেউই কালিনারি ব্যাকগ্রাউন্ডের ছিলো না। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে কিংবা ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছিলো। যারা পড়াশোনার পাশাপাশি একটা কাজ খুঁজতেছিলো। দুইজন তিনজন করে ডাকছিলো। আমার সিরিয়াল পড়ছে একদম শেষে। শেষে আমি সহ আরো দুইজন গেলাম। সবার সিভি দেখলো ,আমার সিভি দেখে যখন দেখলো কালিনারি স্টুডেন্ট তখন বললো আপনি এইখানে কেন এসেছেন আপনি তো এইখানে কাজ করবেন না। আমি বললাম না স্যার যদি সুযোগ পাই অবশ্যই আমি করবো। পড়াশোনার পাশাপাশি আমি কাজের অভিজ্ঞতা নিতে চাই। ওনার কেন জানি আমার এই উত্তর ভালো লাগলো না মনে হলো। বাকি দুইজন কে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করতে লাগলো,কিন্তু আমাকে তেমন করলো না। কিছুক্ষণ পর আমাকে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করলো আমিও উত্তর দিলাম। এরপর বললো দেখেন ভাইয়া আপনি এইখানে বেশি দিন কাজ করবেন না, আপনার পড়াশোনা শেষের দিকে এরপর আপনি হোটেলে চলে যাবেন ইন্টার্নি করার জন্য। আপনার একটা ভালো ফিউচার আছে। আমিও ওনার কথা শুনলাম, পরে বললাম স্যার আমি কাজ করতে চাই, শিখতে চাই সেটা যেখানেই হোক না কেন হোটেল কিংবা রেস্টুরেন্টে কিংবা চেইন রেস্টুরেন্ট আমি অভিজ্ঞতা নিতে চাই যা আমাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। পরে আমাদের তিনজন কেই উদ্দেশ্য করে বললো আপনাদের তিনজন থেকে যেকোন একজন কে নেওয়া হবে। আর আমরা তাকেই নেব যার চাকরিটা ভিষণ দরকার এবং আমাদের সাথে অনেকদিন কাজ করবে। ফোন দিয়ে আপনাদের জানিয়ে দেওয়া হবে। আমি নিশ্চুপ মনে বাসায় চলে আসি। আমি জানি এইখানেও আমার জব টা হবে না। ওনারা ভাবতেছে আমি হয়তো বেশিদিন এইখানে কাজ করবো না। আমার ফোনেও আর ফোন আসলো না।

 

একদিন আমাদের ডিপার্টমেন্ট হেড ওনার অফিসে আমাকে ডাকলো, ক্লাস শেষ করে ওনার সাথে দেখা করার জন্য। সবার মাঝখানে আমাকে ডাকায় সবাই একটু অবাক হলো। আমি ম্যাডামের সাথে গিয়ে দেখা করি, তখন দুপুর নাগাদ, ম্যাডাম আমাকে ওনার একটা কার্ড দিয়ে বললো বনানীতে যাওয়ার জন্য একটা ৪ তারকা হোটেলে ইন্টার্ন নেবে। আমার কার্ড দেখালেই হবে, আমি অবুঝ মনে বলে বসলাম ম্যাডাম ক্লাস, পরীক্ষা এখনো তো শেষ হয় নাই, ওনারা সুযোগ দেবে৷ উনি বললো আপনি এগুলা টেনশন করবেন না, এখনি যান ওইখানে সিভি নিয়ে। কি হয় আমাকে জানাবেন। আমি ও সিভি রেডি করে বের হয়ে পড়লাম আকাশ টা মেঘলা যেকোন সময় বৃষ্টি আসবে। মনের ভিতর ভয় কাজ করছিলো। গ্র্যান্ড টিউলিপ হোটেল, বেশ ঝকঝমক। আমি আরো ভয় পেয়ে যাই এবং নার্ভাস হয়ে যাই। ওইখানে রিসিপশনে গিয়ে সব বললাম আর বললো অপেক্ষা করুন HR আর Executive Chef আসবে। আমি আরো নার্ভাস হয়ে পড়ি। বাইরের দিকে তাকাচ্ছিলাম মনে হচ্ছে একটা দৌড় দিলে বাঁচি। কিছুক্ষণ পর ওনারা দুইজন একসাথে আসলো। এসে ইংরেজিতে কথা বলা শুরু করলো,আমার নার্ভাসনেস আরো বাড়লো। এরপর নিজের সম্পর্কে বলতে বললো আমি ইনিয়েবিনিয়ে কিছুক্ষণ বললাম। এরপর HACCP থেকে শুরু করে ৫-৬টা প্রশ্ন করলো। আমি সব প্রশ্নেরই উত্তর জানি কিন্তু কেন জানি ওইসময় বলতেই পারতেছিলাম না। একটার পর একটা প্রশ্ন করেই যাচ্ছে আর আমি চুপ করে মাথা নিচু করে বসে ছিলাম। নিজের কাছে নিজেকে খুব অসহায় লাগছিলো। এরপর HR বললো আপনি মনে হয় ক্লাসের সবচেয়ে ফাকিবাজ ছেলেটা, ক্লাস ঠিকমতো করেন না তাই না (কথাটা শুনার পর আমার গালে একটা অদ্ভূত হাসি আসে, ওনারা জানেন না এই ক্লাস যেন মিস না হয় সেজন্য ঢাকা থেকে নোয়াখালী গিয়ে ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে আবার ওইদিন আমি ঢাকায় এসে ক্লাস করতাম) আপনাকে আরো শিখতে হবে, জানতে হবে।

আমি আপা কে ফোন দিয়েছিলাম একটা ভালো ছেলে পাঠানোর জন্য, আচ্ছা যাই হোক আপনি এখন আসতে পারেন। কথা গুলো আমি কোন ভাবেই নিতে পারতেছিলাম না, মনে হচ্ছিলো আমার এতদিনের সব কষ্টই বৃথা। বাইরে বৃষ্টি পড়আ শুরু হলো, আমি ভিজতে ভিজতে হাঁটা শুরু করি। এই দিনটার কথা আমার সারাজীবন মনে থাকবে। হয়তো ওইদিনের মতো কষ্ট আমি আর কোন দিন পাইনি। বুক ফেটে কান্না আসছিলো, বৃষ্টির পানিতে হয়তো ওইদিন আমার চোখের পানি কেউ দেখে নাই। ইন্সটিটিউটে গিয়ে ম্যাডামের সামনে মাথা নিচু করে যাই, আমি কিছু বলার আগেই ম্যাডাম বলে বসলো আরে এগুলা কিছু না সীমান্ত, আপনাকে অনেক দূর যেতে হবে, আপনি পারবেন। ওইসব পাগল-ছাগল হোটেল ছাড়া আর কিছু না। আমি বুঝতে পারি ম্যাডামের কাছে হয়তো ফোন চলে আসেছিলো। আমি ম্যাডাম কে পুরো ব্যাপারটা খুলে বলি। উনি বললো বাসায় যান, আমি দেখি অন্য কোথাও কিছু করা যায় কিনা। বাসায় চলে আসলাম দুইদিন নিজের রুমেই ছিলাম,এরপর নিজেকে শক্ত করে আমি থিউরির উপর আরো বেশি নজর দিলাম, যে প্রশ্ন গুলো বলতে পারি নি সেগুলা ভালো ভাবে রিভাইস করলাম। যেন এরপর কোন দিন এই প্রশ্ন গুলো বলে আমাকে কেউ আটকাতে না পারে। আমাদের কোর্সের মাঝখানে আমরা আরো দুইটা এক্সট্রা কোর্স করি একটা হচ্ছে Special Course on Food Hygiene & Sanitation and Special Coirse On Non-Alcoholic Beverages. প্রথম টা আমাদের জন্য মেন্ডেটরি ছিলো আর দ্বিতীয় টা হচ্ছে ইচ্ছার উপর। আমি দুইটাই করি, কারণ আমি বিশ্বাস করি জ্ঞান কোথাও না কোথাও ঠিক কাজে লাগে। এই যে বেসিক ধারণা থাকার কারণে আজ আমি যে ক্যাফে তে কাজ করছি, সেখানে ভালোমতো কফি বানানো শিখে গেলাম এক্সট্রা সময় দিয়ে। যদিও সেখানে আমার বেশি সময় দিতে হয় না কিন্তু হুট করে যখন চাপ হয়ে যায় আর লোক সংখ্যা যখন কম থাকে বারিস্তা টিম এর যখন ম্যানেজার বলে কয়েকটা কফি বানিয়ে হেল্প করতে এর চাইতে আনন্দের আর কিছু হয় না। আমাদের প্রোডাকশন স্টেশন আর কফি মেশিন টা একই জায়গায় ফ্রন্ট এ হওয়াতে আমার জন্য এই কাজ শেখাটা অনেক সহজ হয়েছে। অবসর সময় টা বসে না থেকে কফি শেখার কাজে ব্যয় করতাম।

ওহ হো কোথায় থেকে কোথায় চলে গেলাম
ওই কোর্স টা করার পর “কফি ওয়ার্ল্ড” নামক একটা চেইন শপ এ তখন সিভি জমা দিছিলাম। ওইখান থেকে একদিন ফোন দিয়ে ইন্টারভিউর জন্য ডাকে। তখন এন্ট্রি লেভেলের বারিস্তা + সার্ভিসের জন্য লোক নেবে ওনারা। আমিও গেলাম ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য, ওনারা কিছুটা অবাক হলো যখন শুনলো আমি কালিনারি উপর পড়াশোনা করে সার্ভিস+বারিস্তার জন্য ইন্টারভিউ দিতে এসেছি। আমি আমার আগ্রহের কথা জানালাম, ক্লাসের বাহিরের সময়টুকু আমি কাজে লাগাতে চাই। বিভিন্ন প্রশ্নের বেসিক উত্তর দিয়ে ওনারাও বললো ফোন কলের মাধ্যমে জানাবে। আস্তে আস্তে আমার কাছে অতি আগ্রহের জায়গা টা কিছুটা সহনীয় হয়ে গেয়েছিলো। কারণ অতি আগ্রহ নামক বস্তু টার কিছুটা রুপ আমি সহ্য করে গেয়েছি এর আগে। যার রুপটা খুব কষ্টের। আগে খুব এক্সাইটেড থাকতাম কিছু থেকে কিছু হলেই। এখন কিছুটা সহনশীল নিজের মধ্যেই রাখতে পারি। বরাবরের মতো এবারও সাপ্তাহ খানেক চলে গেল। ফোন আসলো না। একদিন এক খালাতো ভাই ফোন দিয়ে বললো উত্তরা যাওয়া-আসা করতে পারবো কিনা। কারণ আমি থাকি শান্তিনগর, এইখান থেকে উত্তরা যাওয়া-আসা করতে ৪ ঘন্টার বেশি সময় লাগে অসহ্য জ্যামের কারণে। আমি বললাম হ্যাঁ ভাইয়া পারবো, উনি বললো ওনার এক ক্লাইন্ট এর বড় ভাই ওইখানে একটা রেস্টুরেন্ট ওপেন করবে, কাজ প্রায় শেষের দিকে। তখন ভাইয়া আমার কথা বলে। উনি ভাইয়াকে বললো আচ্ছা ওকে সিভি নিয়ে আসতে বলিও আমি ভাইয়ার সাথে কথা বলবো। এরপর সিভি নিয়ে উত্তরায় গেলাম, ওইখানের যিনি মালিক তিনি একজন রাশিয়ান বাংলাদেশি। এবং উনি রাশিয়াতে শেফ পেশায় দীর্ঘদিন কাজ করে, এখন বাংলাদেশে এসে বিজনেস শুরু করতে চান। ওনার সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা বলার পর উনি বললো আচ্ছা তোমার যেহেতু ক্লাস + পরীক্ষা চলছে তুমি চাইলে তোমার সময় মতো আসে পারো নইলে প্রতিদিন আসতে পার। আমি বললাম আমার ক্লাস শুধু সাপ্তাহে দুইদিন হয় এর বাইরের সময় টুকু আমি এখনে কাজ করতে চাই। উনিও বললো আচ্ছা কালকে থেকে তাহলে আসো। সকাল ১১টায় যাওয়ার জন্য বললো, আমি বাসা থেকে বের হয়ে পড়ি সকাল ৯টায়, ১১টা ১০ এ গিয়ে পৌঁছাই। অসহ্য জ্যাম পাড়ি দিয়ে। তখনো কিচেনের সেটআপ, ফ্লোর সেটআপ দেওয়া কিছুটা বাকি ছিলো। সবার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়, এরপর আমি ওনাদের সাথে হেল্প করা শুরু করি, পিকাপে করে বিভিন্ন ধরনের জিনিস পত্র আসতো আমরা ওইগুলা নামিয়ে সেটআপ দিতাম কিচেনে, আবার ফ্লোরের চেয়ার, টেবিল, সোফা,আসতো ওইগুলাও সেটাপ করতাম। এভাবে প্রথম দিন গেল। রাতের ১১টায় ডিউটি শেষ হয়, বাসায় আসতে আসতে প্রায় ১২:৩০ থেকে ১টার মতো বাজতো। আমার বাসা দূরে দেখে এরপরের দিন থেকে আমাকে ১০টায় ছেড়ে দিত কিন্তু তাও বাসায় আসতে আসতে ১টার মতো বাজতো। ঘুম থেকে ৮টায় উঠে ৮:৩০ কিংবা ৯টার মধ্যে বের হয়ে পড়তাম। কিচেনে সবার জন্য শেফ কোর্টে এর মাফ নিতে আসলো,আমি খুব আগ্রহ নিয়ে ছিলাম কিন্তু আমার টা নিল না কারণ আমি ওইখানে ট্রেইনির মতোই ছিলাম। যারা কনফার্ম হয়ে গেছে শুধুমাত্র তাদেরই নিলো আমি ছাড়া। কিছুটা মন খারাপ হলেও কারোকে বুঝতে দেইনি। মোটামুটি আমাদের গোছানো শেষ ফুড ট্রায়াল ও শেষের দিকে। আমাকে দুইদিকেই কাজ করতে হচ্ছে কিচেনে আবার সামনে স্যারের সাথে। টেবিল, সোফা এগুলা গোছানোর কাজে লাগাতো কারণ তখন মাত্র দুইজন মেয়ে আর দুইজন ডোর ম্যান কে সার্ভিস এর জন্য নিয়েছিলো। স্যার আসলেই আমাকে সামনে ডেকে ওনার সাথে নিয়ে যেত আবার কিচেনেও ওনার সাথে এসে বিভিন্ন ফুড ট্রায়াল এর সময় পাশে রাখতো। ওনার সাথে কাজ করার সময় খুব ভালো লাগতো, নিজের বেস্ট টা দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করতাম যার জন্য উনি + ম্যানেজার আমাকে আদর করতো। খুটিনাটি অনেক বিষয় ওনার থেকে শিখার চেষ্টা করতাম। কিচেনে আমি ছিলাম সবার চেয়ে হাজার গুন পিছিয়ে।

প্রফেশনাল কিচেনে তখনো আমার ভালো কোন অভিজ্ঞতা ছিলো না। আমরা পড়াশোনার একদম নিচে পজিশনে কমি ১, কমি ২ এগুলা কিচেন ব্রিগেড এ পড়েছিলাম। কিন্তু বাংলাদেশে প্রায় সব রেস্টুরেন্টে বলে পিকআপ ম্যান বা হেল্পার। ওইখানে হেল্পার যারা ছিলো তারাও আমার চাইতে ওয়েল এক্সপেরিয়েন্স ছিল, কারণ তারা ৩-৪ বছর ধরে কাজ করে এসেছে। আমি তাদের কে রেস্পেক্ট করতাম, তাদের থেকেও শিখার চেষ্টা করতাম কিন্তু তারা সহ শেফরা আমাকে নিয়ে করতো বিভিন্ন ধরনের উপহাস। কারণ আমি একটা পেয়াজ ছিলার আগেই তারা তা চপিং ও করে ফেলতো। লাখ টাকা খরচ করে আমি পড়াশোনা করছি,আমার মতো পাগল তারা আগে দেখে নাই, এইটাই ছিলো ওনাদের ধারণা। আমিও বুঝতে পারি ওনাদের এক্সেপ্টেশন আমার কাছ থেকে ছিল অনেক বেশি, এত টাকা দিয়ে পড়াশোনা করেছি নিশ্চই সব কিছু অনেক ভালো পারতে হতো। এক এক জন বলতো ওনাদের কে অল্প কিছু টাকা দিলেই এর চাইতেও ভালো জিনিস আমাকে শিখিয়ে দিতো। আমিও সব হাসিখুশি ভাবে নিতাম যে যাই বলতো এবং নিজের জায়গা টাও বুঝাতাম আমি শিখতে আসছি সবাই আমাকে হেল্প করিয়েন। আমিও রিয়েলাইজ করি প্র‍্যাক্টিক্যাল ভাবে আমি অনেক অনেক পিছিয়ে আছি। এভাবে চলতে থাকলো, একদিন সকালে বাসে করে উত্তরায় যাচ্ছিলাম আর ডিপার্টমেন্টের শিউলী ম্যাডাম ফোন দিলো। আমি অবাক হলাম, ম্যাডাম কোন সময় আমাকে ফোন দেয় নি, আজ হঠাৎ কেন। ফোন ধরে সালাম দিয়ে কথা বলার পর ম্যাডাম বললো আমাদের কয়েকজনের সিভি ডিপার্টমেন্ট থেকে রেনেসাঁস হোটেলে পাঠানো হয়েছে ইন্টার্নশিপ এর জন্য। ততদিনে আমাদের প্রায় এক্সাম শেষ হয়ে আসছিলো এবং আমাদের সবার সিভি ডিপার্টমেন্ট এ জমা রাখা ছিলো। আমি তখনো রেনেসাঁস হোটেল সম্পর্কে ওতো কিছু জানি না, যতটুকু বুঝলাম একটা হোটেলে সিভি পাঠানো হয়েছে, ফোন দিলে যেন আমরা রেসপন্স করি। আমি ম্যাডামের সাথে যতটুকু সম্ভব কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। আবার এইদিকে স্যাররা ডিসিশন নিলো ওনারা প্রি ওপেনিং করবে রেস্টুরেন্ট, শুরুর দিকে ওনাদের কিছু গেস্ট সহ বাহিরের কিছু গেস্টদের নিয়ে ফুডের কোয়ালিটি, টাইম আনুষঙ্গিক যা আছে সব কিছু টেষ্ট করবে। গ্র্যান্ড ওপেনিং এর আগে। আমরাও ওইভাবে প্রিপারেশন নেই মোটামুটি। প্রি ওপেনিং নভেম্বরের ২৫/২৬ তারিখ, আর সার্ভিস এর বাকিরা জয়েনিং করবে ডিসেম্বরের ১ তারিখ। তাই স্যার আমাকে কিচেন থেকে নিয়ে সার্ভিস টিম এ যারা আছে তাদের সাথে কাজ করতে বলে। পূর্বের একটা অভিজ্ঞতা আর ক্লাসের শেখার অভিজ্ঞতা থেকে ম্যানেজার যখন আমাদের ৫ জন কে ব্রিফিং করছিলো তখন আমি খুব তাড়াতাড়ি বুঝে বাকিদের ও প্লেট ধরা থেকে টেবিল সেটআপ দেওয়া, অর্ডার নেওয়া,ফুড গুলো সম্পর্কে আইডিয়া দেওয়া, কিংবা প্রিপারেশন কিভাবে নেব সব কিছু যখন আবার বুঝিয়ে দিচ্ছিলাম তখন ওনার চোখে পরি, এবং পরে একপাশে ডেকে নিয়ে উনি বললো তোমার কি আগের অভিজ্ঞতা আছে। পরে আমি সব বললাম আর আমাকেই টিম লিডার বানিয়ে দিল উনি। কিছুটা ফাঁকা মাঠে গোল দেবার মতো অবস্থা।

আমিও টিমের বাকিদের সাথে নিয়ে কাজ ভাগ করে দিয়ে মোটামুটি রেডি অপারেশন এর জন্য। প্রি ওপেনিং এর দিন সন্ধ্যার পর থেকে মোটামুটি ভালোই গেস্ট হয়েছে। আমি সহ বাকিদের পারফরম্যান্স দেখে স্যার খুব খুশি, ওইদিন অনেক বেশি কষ্ট করতে হয়েছে যা বলার বাইরে। ওইদিন শেষ করার পর স্যার ম্যানেজার কে বললো দেখছো আমি বলছিলাম না ও পারবে, এই বলে যখন পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো এত ভালো লেগছে। এরপর তো বললো ওকে আজকের গাড়িভাড়া টা দিয়ে দিও। এটা তার জন্য ছোট্ট উপহার। পরে একটা খামে ম্যানেজার আমাকে ৩০০টাকা দেয়। আমিও খুশি মনে বাসার উদ্দেশ্য রওনা দেই, আসার সময় মনে মনে আজকের দিনের কথা চাঁদ মামাকে বলতে বলতে বাসায় চলে আসলাম। পরের দিন আবার বের হয়ে পরি, ১১টার পর একটা ফোন আসে তখন আমি রেস্টুরেন্টে বসে ছিলাম , রেনেসাঁস হোটেল থেকে সিনথিয়া ম্যাম নামক একজন HR ফোন দিয়েছে, আমাদের ইন্সটিটিউট থেকে আমাদের সিবি পাঠানো হয়েছে ৬ তারিখ ইন্টারভিউ আছে ইন্টার্নশিপ এর জন্য আমি কি আসতে পারবো কিনা ,আমি যথারীতি রাজি হয়ে যাই। এরপর ম্যাডাম কে ফোন দিয়ে জানালাম, ম্যাডাম বললো বেসিক এর উপর ভালোমতো প্রিপারেশন নিয়ে যাওয়ার জন্য, আমিও বললাম আচ্ছা। পরেরদিন আমাদের ক্লাস + গ্রুপ ভিত্তিক প্র‍্যাক্টিক্যাল পরীক্ষা ছিলো। পরে জানতে পারলাম প্রফেশনাল শেফ কোর্স আর ডিপ্লোমা থেকে মোট ১০ জনের সিভি পাঠানো হয়েছে। তবে কোন ১০ জন তা কেউ জানে না। আমার সাথের কেউ ছিলো না পরিচিত। সবাই বলতেছিলো তুমি অনেক লাকি, ম্যাডাম তোমাকে খুব আদর করে ব্লা ব্লা ব্লা সবাইকে একটা কথাই বললাম দোয়া করিস শুধু। ওইদিন প্র‍্যাক্টিক্যাল পরীক্ষার পর তারাহুরো করে রেস্টুরেন্টে যাওয়ার জন্য বের হয়ে পড়ি, রাস্তায় অর্ধেক আসার পর মনে পড়লো আজকে আমি আমার নোট খাতাটা ব্যাগে নিছিলাম কিনা। ব্যাগ চেক করে দেখি নোট খাতাটা নেই, আমার ভীষণ ভয় লাগা শুরু করে, ১ বছরের সম্পূর্ণ নোট আমার ওই খাতাটার মধ্যে। বাস থেকে নেমে আবার ইন্সটিটিউটের দিকে রওনা দেই, এরমধ্যে আমার গ্রুপের সবাইকে ফোন দিয়ে বলি কেউ কি দেখেছে কিংবা পেয়েছে কিনা। কেউ দেখে নাই কিংবা খেয়ালও করে নাই। ইন্সটিটিউটে গিয়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম কিন্তু পেলাম না। গ্রুপেও ম্যাসেজ দেই, কেউ পেলে কিংবা ভুলে কারো ব্যাগে চলে গেল কিনা দেখার জন্য। কারো কোন রেসপন্স নেই। আমার মাথার উপর পুরো আকাশ টা ভেঙে পড়লো। আর পেলাম না খুঁজে আমার নোট খাতাটা। সারাটা বছর এতো যত্ন করে রাখলাম, কিন্তু শেষে এসে এমন পরিস্থিতির শিকার হতে হবে আমি মেনেই নিতে পারতেছিলাম না। এইদিকে রেস্টুরেন্টে কাজের প্রেশার আবার ইন্টারভিউয়েরও একটা প্রেশার । ১ তারিখে যখন সার্ভিসের বাকিরা জয়েনিং করে স্যার আবার আমাকে কিচেনে পাঠিয়ে দেয়, তখন ম্যানেজার বলতেছিলো ওরে আমি ম্যানেজার বানাবো আপনি ওকে আমার সাথে দিন, আবার স্যার বলতেছিলো না ও আসছে কিচেনে কাজ করতে সে আমার টিমে থাকবে। আমি খুব মজা পাই ব্যাপার টায়, নিজের উপর কনফিডেন্স ও আসে কিছুটা। কিচেনের শেফদের কে এটা ওটা এগিয়ে দিয়ে টুকটাক কাজ করা শুরু করলাম। ৬ তারিখ ইন্টারভিউর দিন ছুটি নেই ক্লাসের কথা বলে। আগের দিন প্রায় ১:৩০টায় বাসায় এসেছি। এসে যে একটু বই নিয়ে বসে পড়বো সেই সুযোগ টুকু হয়নি কারণ শরীর আর চলছিলো না। ফ্রেশ হয়ে বিছানায় এলান দিয়ে পিঠ লাগানোর সাথে সাথে ঘুম চলে আসে। পরের দিন ১০টায় উপস্থিত থাকার জন্য বললো। আমিও সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে নাস্তা খেয়ে রেডি হয়ে বের হয়ে পড়ি। একটা বাইক নিয়ে চলে আসি।

গুলশানে রেনেসাঁস হোটেলের সামনে ওই প্রথম যাওয়া। ওইদিক দিয়ে অনেকবার যাওয়া আশা হয়েছে কিন্তু কখনো খেয়াল করি নাই। দেখলাম ইন্টারভিউর জন্য অনেকেই এসেছে, কেউ শেফ কোর্ট পরে আবার কেউ সাদা শার্ট পরে। আমি অবশ্য সাদা শার্ট এর দলেই ছিলাম, ফরমাল হয়ে। আসার পর বুঝতে পারলাম এইখানে অনেক ইন্সটিটিউট থেকে ছেলে-মেয়েরা এসেছে। আমার কোন এক্সপ্টেশন ছিলো না আমি এখনে টিকবো আদৌ। আসার পর আমাদের ইন্সটিটিউটের অনেক কেই দেখলাম কিন্তু সবাইকে চোখের দেখায় চিনি ওইভাবে কারো সাথে পরিচয় নেই। দিক নির্দেশনা আর সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট এর সহোযোগিতায় ইন্টারভিউ রুমে গিয়ে পৌঁছালাম। গিয়ে দেখি প্রায় ৪০ এর অধিক ক্যান্ডিডেট বসে আছে। রুমের শুনসান নীরবতা আরো নার্ভাস করে তুলে আমাকে। এরপর HR থেকে সিনথিয়া আপু এসে একজন একজন করে attendance নিতে থাকে।

টাইমের পর যারা আসতেছে তারা অটোমেটিক ভাবে বাদ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের কে বলা হলো একটু পর এক্সিকিউটিভ শেফ আর এক্সিকিউটিভ সু-শেফ এসে ইন্টারভিউ নেবে। এবার যারা টুকটাক কথা বলতেছিলো তাদেরও গলা শুকায়ে আসলো সাথে মনে হলো আমার প্রেশার লো। এক্সিকিউটিভ শেফ ছিলেন জার্মানি আর সু-শেফ ছিলেন বাংলাদেশী যদিও আমি ওনার কথা শুনে প্রথমে ইন্ডিয়ান মনে করছিলাম। পরে সবার সামনেই একজন একজন করে দাঁড়িয়ে ওনারা ইন্টারভিউ নেওয়া শুরু করলো। যাতে করে কেউ মনে না করে ইলিগ্যাল ভাবে কেউ সিলেকশন হচ্ছে। ওনারা শুরুতেই বললো ওনারা নেবে শুধু ৫ জন কিচেনের জন্য ট্রেইনি। এই কথা শুনে আমার ভিতরে যা একটু ইচ্ছা ছিলো তাও নাই হয়ে গেল। কারণ সবাইকে তখন কঠিন থেকে কঠিনতম প্রতিদ্বন্দ্বী মনে হচ্ছিলো। পরে ওনাদের সামনের সিভি গুলা থেকে এক এক করে নাম বলতে থাকে আর একজন একজন করে ইন্টারভিউ দিতে থাকে৷ খুব সহজ প্রশ্নই করছিলো কিন্তু সবাই দাঁড়িয়ে চুপ হয়ে যাচ্ছে, ইনিয়ে বিনিয়ে কোন ভাবে কিছু বলছে, বা প্রশ্নের বাহিরে চলে যাচ্ছে। আমার মনে পড়ে গেল আমার আগের ইন্টারভিউর কথা বনানীর হোটেলটার। আমি ওদের মনের অবস্থা বুঝতে পারছিলাম। সবাই অনেক নার্ভাস হয়ে যাওয়ার জন্য কিছু বলতে পারতেছে না। আরো একজন বিদেশি শেফ এর সামনে। এবার আসলো আমার টার্ন, আমাকে হাইজিন আর HACCP নিয়ে বলার জন্য বলছে আমিও গড় গড় করে বলা শুরু করলাম যা যা মাথায় আসছিলো। এতো সাহস কোথা থেকে আসছে আমি নিজেও জানি না। আমাকে থামিয়ে দিয়ে বসার জন্য বলেছে। আমি ও সুন্দর ভাবে বসে গেলাম। এবার চুপচাপ ভাবে বাকিদের ইন্টারভিউ দেখতেছিলাম আর নোট করতেছিলাম কোন টা কোন টা পারি না। সবার ই প্রায় একই রকম বেসিক প্রশ্ন করা হয়েছে। সবার শেষ হওয়ার পর আমাদের কে শুভকামনা জানানো হয়েছে, বলেছে বসার জন্য কিছুক্ষণের মধ্যে রেজাল্ট জানিয়ে দেবে। আমি আল্লাহকে ডাকা শুরু করলাম,এরপর আধা ঘন্টা পর সিনথিয়া আপু আসলো আর ৫ জনের নামের মধ্যে যখন আমার নাম টা যখন সবার আগে বললো তখন খুশিতে লাফাতে ইচ্ছা করছিলো। আমাদের ৫ জন কে থাকতে বলে বাকিদের কে আসতে বললো আজকের জন্য। সবাই শুভকামনা জানিয়ে বিদায় নিলো, আর ছিলাম আমরা ৫ জন। যার মধ্যে ৩ জন ই আমরা ছিলাম আমাদের ইন্সটিটিউটের। ২ জন শেফ কোর্সের আর আমি ডিপ্লোমার। স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিলো এতো বড় হোটেলে ইন্টার্নি পাব ভাবতেই পারিনি। আমাদের সামনে ফাইল টা রেখে, আমাদের কে বসতে বলে উনি আমাদের জন্য পেপার্স আনতে যায়। জয়েনিং এর জন্য কি কি লাগবে Appointment letter থেকে সব কিছু। এরমধ্যে আমাদের মাথায় চিকন বুদ্ধি ঢুকে, আমরা ছবি তুলে নি নিজেদের ভাইবার রেজাল্ট পৃষ্ঠার। যদিও এটা ঠিক হয় নি। এরমধ্যে আমার মাথায় এসেছে এখন যেখানে আছি সেখানে কিভাবে কি বলবো এইসব, যে কাজিনের মাধ্যমে ঢুকছি উনি আবার কিছু মনে করে কিনা। এরমধ্যে আব্বু-আম্মুকে ফোন দিয়ে জানালাম। বাকি কথা বাসায় গিয়ে বলবো বলে। কিছুক্ষণ পর আপু এসে বাই নেইম এ আমাদের কাগজ গুলো বুঝিয়ে দেয়। এবং পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, মেডিকেল সহ বাকি সব ডকুমেন্টস ১০ তারিখের মধ্যে জমা দিতে বলে এবং এই মাসের ই ১৫ তারিখ থেকে আমাদের জয়েনিং। স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিলো সময়টুকু ১টা ফাইভ স্টার প্রোপার্টিতে ইন্টার্নি করবো, বন্ধুরা মিলে কত স্বপ্ন দেখতাম ক্লাসে আজকে তা সত্যি হতে চলছে।বাসায় যাওয়ার সময় মিষ্টিও নিয়ে যাই ফুপ্পিদের জন্য। পরেরদিন উত্তরায় রেস্টুরেন্টে গিয়ে আগে স্যারের সাথে কথা বলি। ওনাকে কিভাবে যে কথাটা বলি বুঝতেই পারছিলাম না কি না কি মনে করে আবার এইসব মাথায় ঘুরতেছিলো। সাহস করে সত্যি কথাটাই বললাম, উনি খুশি হয়েছে কি না জানি না উনি বললো ওইখানে তো তোমাদের কে গাধার মতো খাটাবে কিন্তু জব দিবে না, আমার এইখানে ২ মাস কিংবা ১ মাস করো তাহলে আমি তোমাকে জব দিয়ে দেব। আমি চুপ করে ছিলাম কিছুক্ষণ কিন্তু মুখ দিয়ে বের হয়ে যায় স্যার আমি ওইখানে করবো। এরপর উনি মোবাইল টা বের করে আমি যেন না বুঝি আমার একটা ছবি তুললো, কিন্তু ক্যামেরার ছবি তুলার সাউন্ড টা হয়তো উনি মিউট করতে ভুলে গেছে। আমি বুঝেও না বুঝার ভান ধরি। এরপর বললো আচ্ছা সমস্যা নাই, ওইখানে তুমি অনেক কিছুই শিখতে পারবা। যদি চাকরি না দেয় আমার এইখানে আবার চলে এসো, আমি তোমাকে চাকরি দেব। এরপর ম্যানেজার কে ডাক দিয়ে খবর টা দিল, ম্যানেজার বললো কবে যেতে চাও আমি বললাম আজকেই স্যার ১৫ তারিখ জয়েনিং এর আগে ১০ তারিখের মধ্যে মেডিকেল আর পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সহ সব পেপার জমা দিতে হবে। স্যার বললো আচ্ছা ঠিক আছে তুমি যেও আজকে লাঞ্চ করে এরপর যেও। আমিও রাজি হয়ে কিচেনে গেলাম, এরপর সবাইকে নিউজ টা দিলাম। ওনাদের কাছে হোটেল মানে ছিলো বিরাট কিছু, আবার যখন বলছি ৫ তারকা হোটেল তখন তো বিশ্বাস ই করতে পারছিলো না। এতোদিন যারা আমাকে নিয়ে ইয়ার্কি, ফাইজলামি করতো হঠাৎ তারা আমার পরম বন্ধু। কিভাবে কি করেছি না করেছি সব জানতে চাইলো। আমিও বললাম সব কিছু,তারা ভাবছিলো আমি জব পাইছি, পরে তাদের ভুলটাও ধরাই দিলাম, ওইখানে যাচ্ছি শিখতে, কাজ করতে যাচ্ছি বিনা পয়সায়। ওনারা ভাবছে আমি মজা করতেছি কিন্তু কিভাবে কি বুঝাই আর। পরে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এসে নতুন জার্নির দিকে পা দিলাম।

 

এরমধ্যে কলেজে গিয়ে স্যার ম্যাডাম কে জানালাম, সবাই অনেক খুশি, আমার সহপাঠীরাও অনেক খুশি। সবাইকে বললাম কিভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে ইন্টারভিউর জন্য।

এইদিকে ওনাদের দেওয়া মেডিকেল সেন্টারে গিয়ে মেডিকেল এর টেষ্ট শেষ করলাম, ওনারা বললো হোটেলে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। পাশাপাশি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ও শেষ করলাম ১০ তারিখের মধ্যে। নতুন নতুন জায়গায় যাওয়া হলো নতুন অনেক কিছুও শেখা হলো।

যে মেডিকেল সেন্টারে গিয়ে মেডিকেল টেষ্ট করালাম সেখানে অনেক মানুষজন ছিলো যারা বিভিন্ন প্রফেশনের কাজের জন্য বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে, আমার ও মনে মনে ইচ্ছা জাগছিলো।

একদিন আমিও এইভাবে হয়তো কোন দেশের জন্য মেডিকেল করাবো। যারা রিপোর্ট নিতে এসেছিলো তাদের মুখে কত সুন্দর হাসি কেউবা ফোন দিয়ে বাসায় জানাচ্ছে সব ঠিকঠাক আছে, মেডিক্যাল রিপোর্ট এ কোন সমস্যা নেই, কি সুন্দর তাদের মুখ চোখ গুলো জল জল করছে। একদিন আমিও হয়তো এমন টা করবো ভেবে মনে মনে আনন্দ পাচ্ছিলাম তাদের আনন্দ গুলো দেখে। সকল ডকুমেন্টস জমা দেওয়া শেষ ১০ তারিখে। ওনারা বললো মেডিকেল রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর আমরা ফোন দিয়ে জানাবো আপনাকে। এরমধ্যে চিন্তা করলাম দুইটা দিনের জন্য বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। এই যাওয়াটা যে একদম ৮/৯ মাসের জন্য হবে ভাবী নি। পৃথিবীর সব চাইতে শান্তি জায়গা মনে হচ্ছিলো নিজের ঘর, পরিবেশ, একটা সুন্দর স্নিগ্ধ সুবাস। যেন প্রাণ ফিরে পাওয়ার মতো। ১৩ তরিখ ফোন আসলো হোটেল থেকে মেডিকেল রিপোর্ট এসেছে আমি ১৫ তারিখ সকাল ১০ টায় যেন ইন্টারভিউ রুমে উপস্থিত থাকি। আমি উচ্ছাসিত, আমি আনন্দিত।

ওইদিন দুপুর নাগাদ আমার ফোনে “কফি ওয়ার্ল্ড” থেকে ফোন আসে আমি ইন্টারমিডিয়েট জয়েন করতে পারবো কিনা। আমি বললাম আমার ইন্টার্নি হয়ে গেছে রেনেসাঁস হোটেলে এই মুহুর্তে আমি পারছি না। তখন উনি বললো আমার তো আপনাকে স্যালারি দেব, ওইখানে তো আপনি তা পাবেন না। আপনি ওইখানে বিনা পয়সায় কাজ করবেন। আমি বললাম জ্বী ঠিক বলেছেন কিন্তু সরি আমি জয়েন করতে পারছি না, আমি আমার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। ধন্যবাদ ফোন করার জন্য। আমি ১৪ তারিখ বাসা থেকে বিদায় নিয়ে আবার ঢাকায় চলে আসলাম। ১৫ তারিখ গেলাম সময়মত ইন্টারভিউ রুমে। পরে জানলাম ওইটা ট্রেনিং রুম। আমাদের সাথে আরো ১০ জনের মতো ছিলো, যারা বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের ট্রেইনিং কিংবা এসোসিয়েট হিসেবে জয়েন করছে। প্রথম দুইদিন আমাদের কে ট্রেনিং দেওয়া হলো। 

রেনেসাঁস সম্পর্কে, MARRIOTT কিংবা IHG হোটেল গুলা সম্পর্কে। আমি আস্তে আস্তে বুঝতে পারি আমি খুব ভালো একটা প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পেয়েছি। আমি আল্লাহ কাছে সবসময় যেকোনো কিছুর জন্যই অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতাম। আমি মুখিয়ে ছিলাম কখন আমরা কিচেনে যাবো। ওইদিন দুপুরে আমাদের কে লাঞ্চের জন্য RADDA তে নিয়ে যাওয়া হয় যেটা মূলত এসোসিয়েট দের খাবারের স্থান। ওইখানে গিয়ে দেখি সবাই খুব সুন্দর ভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার নিচ্ছে, যেখানে সব ডিপার্টমেন্টের মানুষ জন ছিলো।  কিন্তু আমার চোখ সবসময়ই শেফ দিকেই যাচ্ছে। ওনারা একসাথে খাচ্ছে, আড্ডা দিচ্ছে, বুফে নিয়ে কথা বলছে আরো কত কি। আমাদেরকে ট্রেনিং এ বলা হয়েছে সবার সাথে গুড মর্নিং, গুড আফটারনুন, গুড ইভিনিং বলে কথা বলার জন্য। আমরা একপাশে বসে খাচ্ছিলাম আর শেফদের কে দেখছিলাম মুগ্ধ হয়ে। আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না এমন একটা সুন্দর মুহুর্ত আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো।

 কত সুন্দর পরিবেশ একদম ছবির মতো। আর আমার জীবনের প্রথম হোটেল এক্সপেরিয়েন্স টা ছিলো জঘন্য তাই আমার কাছে অন্যরকম এক অনুভুতি হচ্ছিলো। ওইদিন টার কথা ওই সময় গুলোর কথা ভাষায় প্রকাশ করে বলা কিংবা বোঝানো সম্ভব না। খাওয়ার সময় আমার সাথে ঘটে যাওয়ার আগের সব দিনের কথা মনে পড়ছিলো। লাঞ্চ শেষ করে কয়েকজন ট্রেইনিদের সাথে কথা বলে কিংবা যেই সামনে পড়তেছিলো সবার সাথে কুশল বিনিময় করে আমরা আবার ট্রেনিং রুমে চলে যাই। এরপর জানতে পারলাম আমাদের ইন্টারভিউ যে জার্মানির শেফ নিয়ে ছিলেন, তিনি ছিলেন আমাদের এক্সিকিউটিভ শেফ উনি চলে যায়। উনি একদম প্রি-ওপেনিং থেকেই এই হোটেলের এক্সিকিউটিভ শেফ ছিলেন। এবং আমরা কয়জন ছিলাম ওনার শেষ রিক্রুট করা মানুষ। মনে মনে কিছুটা খারাপ লাগলেও ওনার প্রতি দোয়া আর ভালোবাসা রইলো মনে। আমাদের কে মোটামুটি ম্যারিয়ট থেকে শুরু করে কমিউনিকেশন, আমাদের ব্যাবহার কেমন থাকতে হবে, পোশাক-চলাফেরা থেকে সব কিছুই বিস্তর ধারণা দিলো। ওইদিনের মতো শেষ করে আমাদের কে চলে যাওয়ার জন্য বলে, আবার আগামীকাল একই সময় আসার জন্য বলে।

যেসকল বিষয় গুলো গত সেশনে নেওয়া হয় নি প্রথম ঘন্টা খানেক সময় ওই সেশন গুলো হলো। ট্রেনিং সম্পর্কে পূর্বে ভালো অভিজ্ঞতা থাকার কারণে আমি মোটামুটি সব সেশনে ভালো মনোযোগ দিতে পারি, এবং অনেক গুলো চকলেট ও পাই। এরপর আসলো প্রোপার্টি ভিজিট সেশন। আমি জীবনেও কোন ৫ তারকা হোটেলে যায়নি, ওইখানের রুম কিংবা কি কি থাকতে পারে আমরা ইন্সটিটিউটে শুনেছি কিন্তু নিজ চোখে কখনো দেখেনি। আমাদের কে একদম নিচের ফ্রন্ট ডেস্ক থেকে শুরু করে, সকল রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে,ক্লাব লাউঞ্জ, সিগনেচার রেস্টুরেন্ট, হট কিচেন, কোল্ড কিচেন, banquet কিচেন, পেস্ট্রি কিচেন, বার,সু ইমিংপুল, সকল ধরনের রুম শুধু মাত্র চেয়ারম্যান রুম ছাড়া, আগুন লাগলে কোন সিড়ি ব্যাবহার করবো, কোন কোন দরজা শুধু মাত্র ইমাজেন্সি তে খোলা হবে, এসেম্বলি পয়েন্ট কোথায় এইসব কিছু দেখানো হয়। এবং কোনটার বিশেষত কি তা উপস্থাপন করা হয়। স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছিলো, এতোদিন ইন্সটিটিউটের স্যার- ম্যাডামদের কাছ থেকে এইসবের গল্প শুনছি আজকে দেখলাম। কিচেন সহ সব ডিপার্টমেন্টের স্যার, ভাইয়া-আপু, শেফরা আমাদের ওয়েলকাম জানায় আর সাথে শুভকামনা। এরপর আমরা আবার লাঞ্চে চলে যাই। লিফটে করে নামার পর একজনের ছবি সহ একটা লেখা দেখতে পাই যা আমার মন কে খুব ছুয়ে ছিলো, ম্যারিয়ট এর প্রতিষ্ঠাতা J.W Bill Marriot এর।

মোটামুটি আমাদের ট্রেনিং শেষ। আমরা শুধু মাত্র তিনজন জয়েন করি আমাদের ইন্সটিটিউটের, আর দুইজনকে দেখলাম না গত দুইদিন। লাঞ্চের পর এক্সিকিউটিভ সু-শেফ এসে আমাদের কে শেফ অফিসে নিয়ে যায়। ভয় ভয় লাগছিলো৷ কে কোন কিচেনে যায় কেউ বলতে পারে না। আমার টার্গেট একটাই ছিলো যেখানে যাব নিজের বেস্ট টা দিয়ে করার চেষ্টা করবো, শিখবো জানবো এইসব কিছুই। কিন্তু হট কিচেনের কন্টিনেন্টাল সেকশনের উপর প্রবল ইচ্ছা ছিলো। আমি সব সময় এক্সিকিউটিভ শেফ হবার স্বপ্ন দেখতাম, নিজের নাম লেখা সুন্দর একটা শেফ কোর্ট থাকবে, তার নিচে লেখা এক্সিকিউটিভ শেফ। আমি শেফ নিয়ে তৈরী করা অনেক মুভি দেখতাম নিজেকে inspire করার জন্য। আমার সব চাইতে ভালো লাগতো BURNT মুভিটা। আমি অনেকবার দেখেছি। মুভির মতো আমাদের জীবনের মিল নেই কিন্তু স্বপ্ন বা ইচ্ছে দেখতে দোষের কি, আমি একজন মিশেলিন স্টার শেফ এর সাথে কাজ করতে চাই, একটা খুব ফাইন কিচেনে, যেখানো ফুড থাকবে রঙ আর আমাদের হাত থাকবে তুলি, নিজের মতো করে রঙ তুলি দিয়ে ছবি আঁকবো। আমি একজন মিশেলিন স্টার শেফ হতে চাই, আমি পৃথিবী ঘুরতে চাই,পৃ থিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে গিয়ে গিয়ে মানুষের খাদ্য-সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে চাই। সারাবিশ্বের জনপ্রিয় সব খাবার খেয়ে দেখতে চাই বানাতে চাই। আমি চাই আমার হাতের খাবার খেয়ে প্রতিটা মানুষের মনের আনন্দে চোখ বন্ধ হয়ে আসুক। ঠিক এগুলাই আমি স্বপ্ন দেখি। এরপর সেখানে গিয়ে দেখি পেস্ট্রি শেফ ওনার চেয়ারে বসা ছিলো, এক্সিকিউটিভ শেফ এর চেয়ারটা খালি। সু- শেফ ওনার চেয়ারে বসা ছিলো। আমরা শেফদের সাথে পরিচিত হই। এরপর পেস্ট্রি শেফ বললো তোমাদের তিন জনের মধ্যে দুইজন কে পেস্ট্রি কিচেনে কাজ করতে হবে আর ১ জন বাহারে কন্টিনেন্টাল সেকশনে। যেহেতু ১ জন মেয়ে আছে সে অটোমেটিক পেস্ট্রিতে কাজ করবে। আর তোমাদের মধ্যে ডিসিশন নাও কে কোথায় কাজ করবা। আমরা দুইজনই কন্টিনেন্টালে কাজ করতে আগ্রহী, একজন একজনের দিকে তাকালাম শুধু কেউই কিছু বলতে পারছিলাম না কি বলবো একজন একজন কে। পেস্ট্রি শেফ তখন বললো আচ্ছা লটারি হবে।

উনি কাগজ ছিড়ে, দুইটা নাম লিখলো। পেস্ট্রি এবং হট কিচেন। এর মধ্যে ফিলিপ শেফ মুহূর্তে বলে বসলো আমি জানি কে কোথায় পড়বে। তখন শীতল শেফ হাসতে হাসতে বলে বসলো দেখি বলো তো আগে ফিলিপ। তখন শেফ বললো সীমান্ত পেস্ট্রিতে আসবে, আর ও হট কিচেনে। এরপর লটারি করলো, আমি বিসমিল্লাহ পড়ে উঠালাম একটা কাগজ। আমি কাগজ টা খুব যত্ন করে রেখে দেই নিজের কাছে৷ আর আমরা সবাই অবাক হই ফিলিপ শেফ এর কথা কাকতালীয় ভাবে মিলে গেল। উনিও একটা মুচকি হাসি দিলো। এরপর শেফ বললো ওয়েলকাম টু মাই টিম। শেফের অফিস ছিলো ১৭ তলায়, পেস্ট্রি কিচেনও একই তলায়। হট কিচেন হচ্ছে ৩ তলায়, বাহার রেস্টুরেন্টও ওই একই তলায়। আবার আমাদের ফ্লোরে ১৭ তলায় হচ্ছে সিগনেচার কিচেন + ফাইন ডাইনিং টা। যদিও তা তখন বন্ধ ছিলো। এরপর কিচেনে নিয়ে গিয়ে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। পেস্ট্রি কিচেনে সব সময় খুব সুন্দর একটা স্মেল ছিল। আমরা প্রথম দিকে ওই স্মেল টা পেতাম এরপর অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার পর আর পাই না। আমাদের কে ওইদিন ছুটি দিয়ে দিয়েছিলো। বললো আগামীকাল থেকে তোমরা কাজ শুরু করো। শেফ আমাদেরকে নিয়ে সবার সাথে ব্রিফিং করলো। আমি মোটামুটি ফিলিপ শেফ এর কথার স্টাইলে মুগ্ধ হই৷ আমাদের কিচেনে পেস্ট্রি শেফ ছিলেন ফিলিপ শেফ, ৩ জন CDP, 3 COMMIE, বেকারিতে ১ জন ডেমি আর ১ জন কমি। আর দুইজন ট্রেইনি। যার মধ্যে এক জনের এই মাসেই শেষ হবে। আমাকে ইভিনিং এ আসতে বলা হয়েছে ২টার মধ্যে কিচেনে ঢুকতে হবে লাঞ্চ শেষ করে। তাই শেফ বললো ১ টার মধ্যে হোটেলে ঢুকে যাওয়ার জন্য। আর আপু কে মিডেলে আসার জন্য বলা হয়েছে। আমাদেরকে যাওয়ার সময় HR অফিসে দেখা করে যেতে বলা হয়েছে। আমরাও গেলাম, যাওয়ার পর আমাদের কে পার্সোনাল লকারের চাবি আর ফিংগার এ এটেন্ডেন্স এর জন্য নিয়ে যাওয়া হলো। সব কিছু শেষ করে বের হলাম। গুলশান লেক পাড় দিয়ে হেঁটে হেঁটে লিংক রোড যাচ্ছিলাম বাসে উঠার জন্য, মনে মনে চিন্তা করছিলাম কি সুন্দর না একটা দিন গেল, একটু মনটাও খারাপ ছিলো কিন্তু আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছিলাম বার বার এখনো কোর্স শেষ হওয়ার ১৫ দিন বাকি থাকতেই আল্লাহর রহমতে ইন্টার্নি পেয়ে যাই। মনে হচ্ছিলো স্বপ্ন গুলো সত্যি হওয়ার পথে আরো একধাপ এগিয়ে যাই। এভাবে চলতে শুরু হলো আমার ইন্টার্নশিপ এর পথ চলা। পরের দিন সময় মতো লাঞ্চ শেষ করে কিচেনে চলে যাই৷

আমাদের কে কোথায় কি কি আছে, সব কিছু দেখিয়ে দেওয়া হলো। এরপর চিলার, ফ্রিজার কোথায় কি রাখতে হয় এইসব কিছু দেখিয়ে দেওয়া হলো। এরপর আমাদের সিনিয়র ট্রেইনি যারা ছিলো, তাদের কে টুকটাক হেল্প করা শুরু করলাম। কেউ কিছু বানালে পাশে থেকে দেখছিলাম। কোন সময় কি কাজ হয়, কি করতে হয় এইসব কিছু আমাদের কে বুঝিয়ে দিচ্ছিল। আমাদেরকে শেফ বলেছিলো তোমরা যা বানাবে সব কিছু নোট করে রাখবে, কতক্ষণ বেকিং করতে হয়, কোনটার পর কোনটা দিতে হয় সব কিছু লিখে রাখবে। একবার যেটা বানাবে সেটা যেন বার বার দেখাই দিতে না হয় এইসব কিছু। আমাদের ভাগ্য অনেক ভালো ছিলো ,আমরা শুরুতেই একটা বড় ইভেন্ট পেয়ে যাই। প্রথম দিকে না বুঝলেও পরে বুঝতে পারি হোটেল ইন্ডাস্ট্রিতে ক্রিসমাস এর সময় অনেক বড় ইভেন্ট হয়। আর বড় ইভেন্ট মানে নতুন নতুন সব আইটেম, ডেকোরেশন, থিম অনুযায়ী গার্নিশিং, আবার সামনে New year ও৷ কিচেন খুবই ব্যস্ত, আর ব্যস্ত কিচেন মানেই অনেক কিছু শেখা। শেফরাও বলতেছিলো তোমরা অনেক ভাগ্যবান। আমি মোটামুটি সবাই কে এটা ওটা এনে দিয়ে হেল্প করা শুরু করলাম। আমাদের সিনিয়র যে ট্রেইনি এই মাসে চলে যাবে, তাকে বলে দিয়েছে আমাদের দুইজনকেই যেন তার কাজ গুলা বুঝিয়ে দেয়। সে যাওয়ার পর যেন ওইসব কাজ গুলা আমরা করতে পারি। উনিও আমাদের কে বুঝিয়ে দিতে থাকে সব। ডিনার ব্যুফের ট্রলি কোন সময় বের করতে হবে, আইসক্রিম রিফিল কিভাবে করতে হবে, আবার ক্লাব লাউঞ্জের ফুড কিভাবে রেডি করতে হবে, ব্রেড গুলা কিভাবে রেডি করতে হবে। এইসব কিছুই আস্তে আস্তে আমরা শিখতে থাকি। মূলত ইভিনিং শিফট পরের দিনের ডিনার এবং ব্রেকফাস্ট ব্যুফের জন্য প্রোডাকশন করে যায় এবং ডিনার ব্যুফে টেককেয়ার করে পাশাপাশি ক্লাব লাউঞ্জ। নাইট শিফট বেকারির সকল প্রোডাকশন করে, GBC ক্যাফেতে ভোর বেলায় সব কিছু চেঞ্জ করে ফ্রেশ আইটেম গুলো দেয় ও ব্রেকফাস্ট ব্যুফে রেডি আর টেককেয়ার করে। মর্নিং শিফট আগের দিনের প্রোডাকশন গুলোকে ফাইনাল করে, ট্রলিতে রেডি করে রাখে ওইদিনের ডিনার ব্যুফের জন্য। ব্রেকফাস্ট ব্যুফে ক্লোজ করে। এরমধ্যে কোন এমিনিটিজ কিংবা কোন অর্ডার থাকলে তা রেডি করে৷ আর প্রত্যেক শিফটই GBC ক্যাফে সমান ভাবে টেককেয়ার করে। কোন আইটেম শেষ হয়ে আসলে, ফোন দিয়ে জানিয়ে দেয় এবং এরপর আমরা তা রিফিল করে দিতাম ক্রিসমাস আসার আগেই আমাদের ফাইনাল এক্সাম শেষ হয়ে যায় ইন্সটিটিউটের। আর এইদিকে আমরা ফুল ফোকাস দিয়ে আমাদের কাজ শুরু করি এভাবে আস্তে আস্তে ক্রিসমাস, নিউ ইয়ার, Valentines Day, Eid, বিয়ের ইভেন্ট, কিংবা অন্য অনেক বড় বড় ইভেন্ট গুলো আমরা শেষ করতে থাকি। ক্রিসমাস ইভেন্ট শেষ হবার পর পরই, নিউ ইয়ারের সময় আমাদের ৯০০ কেজি বিভিন্ন ওজনের কেক এর অর্ডার আসে প্রিমিয়াম ব্যাংকের। যার কারণে একদিন বাসায় ও যেতে পারিনি, হোটেলে থাকার সুযোগ ও হয় শেফদের সাথে। এক্সিকিউটিভ শেফের রুমে আমরা ছিলাম আহ কত সুন্দর সময় পার করে ছিলাম আড্ডা আর মুভি নাইট করে। ইভিনিং শিফট এ যখন ছিলাম তখন ডিনার ব্যুফেতে লাইভ স্টেশনে আমরা দাড়িয়ে ফুড সার্ভ করতাম গেস্টদের , আবার কোন কিছু শেষ হয়ে আসলে দৌড় দিয়ে রিফিল এর জন্য চলে যেতাম। এরপর ডিনার ক্লোজ হলে সব কিছু ট্রলিতে করে নিয়ে আসতাম ৩ তালা থেকে ১৭ তালায়। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে থাকতাম ওই জায়গা থেকে বাহার রেস্টুরেন্টের লাইভ কিচেন দেখা যেত, আমার মন টা ওই জায়গায় পরে থাকতো। ফ্লেমিং, স্মোক, সিয়ারিং এইসব কিছু আমার কাছে মিউজিক এর মতো ভালো লাগতো, আমার মন টা ওইখানেই থাকতো বেশির ভাগ সময়। বার বার মনে হতো থ্রি ইডিয়টস ছবির একটা ডায়লগ এর কথা তুমি প্রেম কর একজনের সাথে আর বিয়া করতেছ আরেকজনকে। এভাবে সময় যেতে থাকে, আমাদের সিনিয়ররাও চলে যায়, আমরা তখন মোটামুটি সব কিছু আয়ত্ত করে নি। রেসিপি বুক দেখে, প্রোডাকশন লিস্ট অনুযায়ী আমরা প্রোডাকশন করা শুরু করে দিতাম, শুরুর দিকে যে কাজ গুলো করতে অনেকটুকু সময় লাগতো আস্তে আস্তে তা আমরা দ্রুত করতে পারতেছিলাম। এভাবেই মর্নিং, ইভিনিং, নাইট ৩ শিফটের কাজই আমি করতে পারতাম। মোটামুটি শেফদের অনেক ভরসার জায়গায় চলে আসি। আমিও নিজের মতো করে সুখ খুঁজে প্রতিদিন নতুন কিছু শিখবো জানবো বলে কাজ করে যাচ্ছিলাম।

প্রায় ৪ মাস যাওয়ার পর, একদিন শেফদের মিটিং শেষে ( প্রতিদিন শেফ অফিসে সকল কিচেনের সিনিয়র শেফরা মিটিং করে) কোল্ড কিচেনের একজন সিনিয়র শেফ এসে হঠাৎ আমাকে বলে সীমান্ত কাল থেকে তুমি কোল্ড কিচেনে কাজ করবে। আমার হঠাৎ করে কেমন জানি খারাপ লাগা শুরু করলো। কিচেনের মোটামুটি সবাই চুপ হয়ে ছিলো, কেউ কোন কথা বলছিলো না। আমিও কিছু বুঝছিলাম না কি বলবো। আমি মাথা নিচু করে বললাম আচ্ছা শেফ। শেফদের মিটিং শেষ হবার পর আমাদের কিচেনে প্রতিদিন ব্রিফিং হয় কাজ নিয়ে,পরেরদিনের প্রোডাকশন নিয়ে, ডিনার ব্যুফে নিয়ে ইত্যাদি ইত্যাদি। ওইদিন ব্রিফিং এ পেস্ট্রি শেফ বললো কোল্ড কিচেনের দুইজন অসুস্থ আর একজন এক্সিডেন্ট করছে। এইজন্য তাদের ওইখানে সাপোর্ট করার জন্য কয়েকদিনের জন্য লোক লাগবে। তাই তারা সীমান্ত কে নিতে চায়। আর সে যেহেতু পেস্ট্রিতে প্রায় ৪ মাসের মতো কাজ করেছে, সেজন্য আমিও মানা করতে পারছিলাম না। নিয়ম অনুযায়ী নাকি ২ মাস পর পর সবাইকে এক কিচেন থেকে আরেক কিচেনে নিয়ে যায়।

আমার চোখ ভিজে কান্না চলে আসছিলো। এই মূহুর্তে নতুন একটা জায়গায় গিয়ে আবার কিভাবে মানিয়ে নেব। আমার অবস্থা দেখে শেফ বলছিলো ‘আরে তুই যা না কয়দিনের জন্য এরপর আবার আমি তরে নিয়ে আনবো সমস্যা নাই। আর কিছু হলে আমারে জানাবি,আমি আছি।মন খারাপ করিস না।‘ পেস্ট্রি কিচেনের সবাই যেমন আন্তরিক ছিলো তার উল্টো টা ছিলো কোল্ড কিচেনের মানুষ জন। কেমন যেন ব্যাবহার করতো, তারা নিজেরা হাসতে জানতো কিনা জানি না। আমার কাছে নরকের মতো লাগা শুরু করছিলো প্রথম দিন থেকেই দুই একজন শেফের কারণে। ওইখানে প্রায় ৪/৫ জন ছিলো ট্রেইনি। আমি ছিলাম সবার নতুন, আমি বাদে বাকি যারা ছিলো তারা প্রায় ৩ মাসের মতো ওই কিচেনে কাজ করছে তাই তারা আমার উপর একধরনের চাপ সৃষ্টি করতো। আমি মেনে নি, কিছু থেকে কিছু হলেই অনেক কথা শোনাতো। এভাবেই ২০ দিন কেটে যায় আমি আর নিতে পারছিলাম না, পরে ফিলিপ শেফ কে সব কিছু জানাই উনি এরপর আমাকে ইন্ডিয়ান কিচেনে ট্রান্সফার করে। আমি যেন মুক্তি পেলাম জেলখানা থেকে নরক থেকে। ইন্ডিয়ান কিচেনের শেফরাও ছিলো আন্তরিক। ২ জন ডেমি আর দুইজন কমি দিয়ে চলতো ইন্ডিয়ান কিচেন।

ওইখানে তখন আমি ছাড়া অন্য কোন ট্রেইনি ছিলো না। ইন্ডিয়ান কিচেনের এক সাইডে ছিলো জিবিসি কিচেন আরেক পাশে ছিলো কন্টিনেন্টাল কিচেন, যদিও সেটা একটা রুমের পর। কন্টিনেন্টাল কিচেনে একজন জুনিয়র সু-শেফ ছিলেন যিনি এই তিনটা সেকশনই দেখাশোনা করতেন। আমি অল্প দিনের মধ্যেই ওনাদের ভরসার পাত্র হয়ে উঠি। ওনারাও আদর করে আমাকে বাবু ডাকতো। ব্যুফেতে রিফিল কিংবা সঠিক টাইমে ফুড লাগিয়ে দেওয়া। কোন কিছু আর্ডার আসলে যা যা লাগবে সব কিছু অল্প কয়দিনের মধ্যে আয়ত্ত করে নি। আমার কাজ দেখে জুনিয়র সু-শেফ ও আমাকে অনেক আদর করতো এবং বাবু নামে ডাকতো। আমাদের ইন্টার্নি ছিলো ৬ মাসের, আমার প্রায় ৫ মাস ছুঁই ছুঁই। আমার শেষ হয়ে আসতেছিলো ইন্টার্নি কিন্তু আমি কি শিখতেছি আমি বুঝছিলাম না। এইসব কিছু তখন হঠাৎ আমার মাথায় ঢুকে পড়ে। আমি দুপুর ১টা বাজে কিচেনে ঢুকতাম আর হোটেল থেকে তখন বের হতাম ১২:৩০টার ও পরে, সারাদিন কাজ করতাম কিন্তু কি শিখতেছি কিছুই বুঝতাম না। ইন্টার্নি শেষ হলে কোথায় চাকরি পাবো কিংবা করবো, ইন্ডিয়ান কিচেনে তো কাজই করতেছি কিন্তু নান রুটি আর পাপাডাম ছাড়াতো কিছুই বানাতে পারি না। রান্নার সব কিছু শেফরা করতো কিংবা কাবাব সব কিছু শেফরাই মিক্সড করে দিত টাইমিং এর কারণে আমি কিছুই দেখতে কিংবা করার সুযোগই পেতাম না। আমি আদা-রসূন-পেয়াজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম শুধু, বাজার গোছাতাম, চিলার-ফ্রিজার চেক দিতাম, ব্যুফেতে ফুড লাগাইতাম, রিফিল করতাম, ব্যুফে ক্লোজ করতাম, সব কিছু চিলার-ফ্রিজারে রাখতাম এইভাবেই তো সময় চলে যাচ্ছে। আমি ঘাবড়িয়ে যাই। আমি তখন খেয়াল করলাম একমাত্র পেস্ট্রি ছাড়া আমি আর কিছুই জানতাম না। একজন মানুষ ও ছিলনা যে যার কাছ থেকে কোন আইডিয়া নেব, যে কোন সাজেশন দেবে কি করবো আমি। আমি করতে চাই কিন্তু পথ দেখিয়ে দেবার মতো কেউ ছিলো না। আমি আবার ফিলিপ শেফের সাথে কথা বলে পেস্ট্রিতে চলে যাই। কারণ তখন অবদি আমি একটু যা জানতাম পেস্ট্রির টুকুই জানতাম তাই শেষমেষ ওইটা দিয়েই শেষ করতে চাই। আবার পেস্ট্রিতে গিয়ে প্রাণ ফিরে পাই।

পেস্ট্রিতে জসিম শেফ নামে একজন শেফ ছিলেন, যিনি আমাকে আদর ও করতেন আবার বোকা-ঝোকাও করতেন৷ উনি তখন বললেন আমি ভুল একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি পেস্ট্রিতে আবার এসে। ইন্ডিয়ান কিচেনে নাকি আমার নামে ভালো কথা শুনছেন উনি, সু-শেফ ও আমাকে পছন্দ করতেন, উনি আমাকে বলে আপনার জন্য সবচেয়ে বেস্ট হবে ইন্ডিয়ান কিচেনে কাজ করা যেখানে আপনি সুযোগ ও পেতে পারেন কাজ করার। আমি তখন আবার চিন্তায় পরে যাই কি করলাম। শেফ কে বুঝানোর ট্রাই করলাম আমার জায়গা থেকে শেফ আমি ওইখানে কিছু শিখতে পারছিলাম না, শুধু কাজই করে যাচ্ছিলাম। তখন শেফ বললো আপনার বয়স এখনো কম তাই বুঝতেছেন না, যখন আমার মতো বয়সে আসবেন তখন ঠিক ই বুঝবেন আমার কথা। একবার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম পেস্ট্রিতে আসার জন্য শেফ কে এতো রিকুয়েষ্ট করে এখন আবার কিভাবে বলি ইন্ডিয়ান কিচেনে যাব আবার। আমার সময় ও শেষ হয়ে আসছিলো, তারপর শেফের সাথে কথা বলে আমি আরো দুইমাস এক্সটেনশন করাই আমার ইন্টার্নি। পেস্ট্রিতে যখন এতদিন ছিলাম আরো দুইমাস থেকে ভালোমতো শিখে এখান থেকে বের হবো যেন একটা জব পাই। এরপর সব চিন্তা বাদ দিয়ে কাজের প্রতি আরো ফোকাস দিলাম। রোজার মধ্যে নাইটে ডিউটি করলাম পুরো মাস, তখন সহুর ব্যুফে ছিলো। ওই প্রথম জীবনে ২৪ বছর বয়সে এসে বাবা-মা কে ছাড়া ঈদ করলাম হোটেলে। আমাকে কাজ করতে হবে যেভাবেই হোক একটা ভালো চাকরি পেতে হবে। আমার সাথে যে আপুটা ছিলো তাকে আমাদের পেস্ট্রি কিচেনে ক্যাজুয়াল এ নিয়ে নিল। খারাপ না লাগলেও মনে কিছুটা আফসোস আর হতাশা কাজ করছিলো। আমাদের কিচেনে আরো দুইজন সহ মোট ৪ জন ট্রেইনি নতুন করে আসে। রাজেশ ভাইয়ার মতো এবার আমার কাঁধেও দ্বায়িত্ব চলে আসে, আমি বের হবার আগে যেন তাদের কে সব কাজ শিখিয়ে দিয়ে যাই। আমি তখন ভাবতে লাগলাম এটাই মনে হয় শেষ সময়ে যাওয়ার আগে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আমিও ৪ জনকেই সব কিছু শিখিয়ে আমার ইন্টার্নি শেষ করি। এরমধ্যেই রেনেসাঁস হোটেলে রেখে আসলাম আমার ৮ মাসের অসংখ্য স্মৃতি, ভালোবাসা আর না বলা অনেক গল্প আর মনের কথা। এরপর শুরু হয় জীবনে আসল যুদ্ধ, একটা চাকরি পাওয়া নিয়ে৷ প্রতিটা দিন নিজের চোখের পানি ফেলতাম। কেন যে আরেকটু সিরিয়াস ভাবে কাজ করিনি।কোথাও কোন জব পাচ্ছিলাম না। ইচ্ছা করছিলো আবার ও ইন্টার্নি শুরু করি। জসিম শেফের কথাও বার বার মাথায় আসতো ভুল সিদ্ধান্ত নেইনি তো। একটা চাকরির জন্য কত মানুষে কে ফোন দিতাম। খোঁজখবর রাখতাম, কিন্তু কোথাও হচ্ছিলো না। এরমধ্যে আমাদের ইন্সটিটিউটের রেজাল্ট ও দিয়ে দেয় ১০০ মধ্যে ৭৮.৮০ পেয়ে পাশ করি। আবার যে ডিগ্রি পরীক্ষা আর দিবই না ভাবেছিলাম সেখানেও সেকেন্ড ক্লাস পেয়ে পাশ করি। প্রায় দুই মাস কোথাও জব পাই না, আমি ভাবছিলাম আমার জার্নিটা হয়তো এইখানেই শেষ।

আল্লাহ’তালার রহমতে জসিম শেফ একদিন ফোন দিয়ে বলে চাকরি করবেন নাকি, কোথায় আছেন? আমিও নিজের জায়গার কথা বললাম। এরপর বললো একটা নাম্বার দিচ্ছি ফোন দিয়ে কথা বলেন, আপনি আর ইমরান সেখানে যাবেন। ইমরান ছিলো আমাদের ওইখানের ট্রেইনি, তার অক্টোবরে শেষ হবে।
এরপর ফোন দিয়ে মিরাজ শেফের সাথে পরিচয়। উনি সিভি নিয়ে আশার জন্য বলে ক্যাফেতে আমাদের দুইজন কে। আম্মু তখন অসুস্থ ছিলো,বিভিন্ন ডাক্তার দেখাচ্ছিলাম। এই খবর টা শোনার পর আম্মু বলে আমাকে নিয়ে চিন্তা করিস না, তুই যা প্রিপারেশন নে। চাকরি টা পেলে তোর বাবা খুব খুশি হবে।
আমরা দুইজন গেলাম,মিরাজ শেফ কে ওই প্রথম দেখলাম। আমাদের দুইজনের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে, এরপর বসার জন্য বলে ম্যানেজার আসবে এরপর উনি কথা বলবে। আমরাও অপেক্ষা করলাম, স্যার আসলো এরপর সিভি দেখে বললো আপনার তো কাজের এক্সপেরিয়েন্স নেই ইন্টার্নি ছাড়া। আমিও জ্বি স্যার বললাম। এরপর আর বেশি কথা বললো না। স্যালারি এক্সপেক্টেশন কত তা জিজ্ঞাসা করে আর কিছু বললো না। এরপর ইমরান কে ডাক দিল, দুইজনকেই একই কথা বললো। মিরাজ শেফ ফোন দিয়ে আপনাদের কে জানাবে। আমরাও বিদায় নিয়ে চলে আসলাম। এরপর ফোনের অপেক্ষা। একদিন পর মিরাজ শেফ ফোন দিয়ে যখন বললো আপনার জব কনফার্ম হয়েছে বেসিক স্যালারি ধরছে ৮ হাজার টাকা, এর চাইতে খুশি মনে হয় কখনো ছিলাম না। এত ফ্রাস্ট্রেশনের মধ্যে ছিলাম যে এই খবর টা শুনে চিৎকার দিতে ইচ্ছা করছিলো। জসিম শেফ কে ফোন দিয়ে খবর টা দিলাম বললো এখন টাকার পিছনে ছুটিয়েন না, কাজের পিছনে ছুটেন, একদিন ঠিকই টাকা আপনার পিছনে ছুটবে। আপনাকে যে অনেক দূর যেতে হবে,আপনি পারবেন। শেফ ওইদিন বলছিল ১৮-২০ হাজার টাকা স্যালারি পাব হয়তো এইজন্য কথাটা বলছে আমি তখন টাকার কথা একবার ও ভাবি নাই, শুধু একটা চাকরিই খুঁজছিলাম। বাসায় এসে জানানোর পর সবাই খুব খুশি হয় কিন্তু যখন স্যালারির কথা বলি তখন নিজের আপন মানুষ গুলাই ইস ইস করে শব্দ করছিলো। ঢাকা শহরে অনেক কাজের বুয়াও এর চাইতে বেশি বেতন পায়, আরো অনেক কথা শুনতে হইছে অনেকের থেকে। দোষ গুলো আসলে আমার নিজেরই। যখন ইন্সটিটিউটে পড়াশোনা করতাম তখন আমাদের অনেক বড় বড় স্বপ্ন দেখানো হতো, এই যেমন চাকরির অভাব নেই, কোথাও ঢুকলেই সর্বনিম্ন ২৫-৩০ হাজার টাকা স্যালারি হবে আরো অনেক কিছু। আর আমি নিজেও ওইসব বাসায় এসে শেয়ার করতাম। যা আমার করা উচিৎ হয় নি৷

আমার আনন্দ আর বেশি দিন সইলো না,

ওই মাসেই দিগন্ত আর ইমরান চলে যায় না বলেই, আমার উপর দুইজনের কাজের প্রেশার চলে আসলো। আমি একা মর্নিং এ কাজ করতাম আর শেফ একা ইভিনিং এ। আমি সকাল ৮ টা থেকে ৬,৭,৮,৯ টা এমন কি ১০টা পর্যন্ত ও ছিলাম। একেকদিন এক এক সময়ে বের হতাম। কোন সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়াই টানা ১টা মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাই। নিজেকে শুধু বলতাম একদিন ভালো সময় আসবে, ধৈর্য রাখতে হবে। মিরাজ শেফ প্রতিনিয়ত উৎসাহ দিয়ে যেত। ১ মাস পর হট কিচেন থেকে একটা ছেলে সুমন কে এনে দেয় আমাদের টিমে শেফ। বললো লোক খুঁজছি আসবে। সুমন পেস্ট্রি সম্পর্কে কিছুই জানতো না, আমি যা কিছু জানতাম আস্তে আস্তে সুমন কে হাতে-কলমে শেখাতে শুরু করি। ভুল করলেও কিছু বলতাম না কারণ ভুল করেই তো আমরা শিখে চলেছি। সে আসার কয়দিন পর আমি ১ দিনের জন্য ছুটি পাই। কি যে শান্তি লাগছিলো কিন্তু সকাল গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা হয় কিছুটা মিস করছিলাম কাজ গুলো কে। কারণ টানা এতোটা দিন কোন ছুটি ছাড়াই কাজ করে যাচ্ছিলাম। অফিস, বাসা আর ঘুম এই তিনটা জিনিস নিত্যদিনের রুটিন হয়ে গেল।

মিরাজ শেফ প্রায় সময় বলতো ঘুমিয়ে সময় নষ্ট করো না, শেখার চেষ্টা করো প্রতিনিয়ত। শেফ এর সামনে মুখ ফুটিয়ে কিছু বলতে পারি না, কি শিখবো, কোথা থেকে শিখবো কিংবা কার কাছ থেকে শিখবো কোন কিছুই যে পাচ্ছিলাম না। কোন রাস্তাই পাচ্ছিলাম না নিজেকে development করার। বাহিরের দেশে অনেক গুলো কোর্স, ডিগ্রি এগুলোর সম্পর্কে খোঁজখবর নেই, ভিডিও দেখি। ওইগুলা দেখার পর মনে হলো বাংলাদেশে আমরা এই ১টা বছর কিছুই তো শিখলাম না।

Le Cordon Blue বিভিন্ন দেশের ভিডিও গুলো দেখে পড়ার ইচ্ছে জাগে, কিন্তু তাদের কোর্স ফি গুলো দেখে, সাহস করে কোন সময় বাবা-মা কে বলতে পারি না। বাবা রিট্যার্ড করার আগেই ওনার বড় বড় দুইটা রোগ হয়, ওপেন হার্ট অপারেশন হয় ২০১৭ তে আর ক্যান্সার ধরা পরে ২০১৯ এ। এদিকে ছোট ভাইটাও প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে BBA তে পড়াশোনা করছে। আমরা বাড়িতে তখনো নিজস্ব কোন ঘর করতে পারিনি। এখনো দাদার বানানো ঘরেই থাকি। ছোট বেলা থেকে মায়ের একটা স্বপ্ন ছিলো ওনার নিজের একটা ঘর থাকবে কিংবা বাড়ি থাকবে। যা উনি নিজের মতো করে সাজাবে। ওনার এই আফসোস টা এখনো থেকে গেল। কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখের জিনিস কি, আমি কোন কিছু চিন্তা না করেই বলবো ফ্যামিলির সুখ ,বাবা-মা ভালো থাকার সুখ, তাদের সম্পর্ক গুলো ভালো থাকার সুখ। ফ্যামিলির সমস্যা পৃথিবীর বড় সমস্যা৷ পৃথিবীর সবচাইতে শান্তির জায়গা টা হচ্ছে, ফ্যামিলি যদি শান্তিতে থাকে। আমি সেই শান্তি টা ছোটবেলা থেকেই খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। প্রতিনিয়ত বাস্তবতার সম্মুখীন হয়ে এখন বুঝতে পারি, পৃথিবী টা দেখতে যেমন সুন্দর ঠিক তেমনি নিষ্ঠুর কিন্তু এর মধ্যে থেকে সুখ খুঁজে আমাদের কে চলতে হয় কিংবা মানিয়ে যেতে হয়।

যে যাই বলুক একটা চাকরির জন্য আমি যে পাগলের মতো ছোটাছুটি করছিলাম, যেখানে মনে হচ্ছিলো নিজের স্বপ্ন গুলো হয়তো ওইখানেই শেষ সেখানে একটা জব পাওয়া ছিলো আমার কাছে সবচেয়ে দামি। আম্মু তখন অসুস্থ, ওনাকে নিয়ে বিভিন্ন ডাক্তার কাছে যাচ্ছিলাম, টেষ্ট করাচ্ছিলাম রিপোর্ট গুলো নিয়ে দৌড়াদৌড়ি। তাই শেফ কে বলে ২ দিন পর জয়েন করি Comptoirs Richard এ। যেখানে আমি , ইমরান, দিগন্ত নামে একটা ছেলে,একজন বেকারি + পেস্ট্রি দেখাশোনা করতো রাশেদ শেফ আর মিরাজ শেফ ছিলেন আমাদের এক্সিকিউটিভ শেফ। এইখানে ১৭-১৮টা পেস্ট্রি নিয়ে আমরা কাজ করতাম। শুরু হয় আমার নতুন এক যাত্রা, তবে কিছুটা অদ্ভুত এইখানের মানুষ গুলো। মিরাজ শেফ প্রায় বেশিরভাগ সময় হট কিচেনে সময় দিতো, তখন হট কিচেন সেটআপ দেওয়া শেষে শুরু হওয়া নতুন মেনুর অর্ডার। শুরুর দিকে খুব খুশি হই যখন শুনি আমাদের এইখানে পেস্ট্রি বেকারিতে যিনি আছেন উনি হলি আর্টিজানে কাজ করতো আগে৷ অনেক নতুন নতুন জিনিস ওনার থেকে শিখতে পারবো, কারণ হলি আর্টিজান বাংলাদেশে অনেক নামকরা ছিলো। 

ওইখানের শেফদের সাথে কাজ করার জন্য নাকি অনেকেই পাগল থাকতো এইসব ও শুনতাম আগে। আর আমি মেঘ না চাইতে বৃষ্টি। শুকরিয়া আদায় করছিলাম। আমাদেরকে তেমন কোন কিছুই বলতো না, কিন্তু আমরা এইসব আইটেম এর চেয়েও বেশি হোটেলে করে আসছি। শুধু এটা ওটা আগাই দিতাম পরিষ্কার করাতো এইসব কিছু। আমাদের আগে যে ওইখানে কাজ করতো দিগন্ত নামে, তাকে বললাম ভাই আপনি তো অনেক কিছু শিখেছেন তাই না, আমাদের কেও শিখিয়েন কিছু তখন সে বাস্তবতা তুলে ধরলো। ওই শেফ নাকি সব কিছু নিজে করতে চাইতো, সহজে কারোকে কিছু বলতো না, একদম না পারতে। তার জন্য অনেক প্রোডাকশন নাকি আটকে থাকতো আরো অনেক কিছু। এরপর হঠাৎ করে হোটেলে আমাদের সিনিয়র শেফদের কথা মনে পরে গেল, ওনারা বলতেন আপনারা খুব ভাগ্যবান ফিলিপ শেফের মতো মানুষ পেয়েছেন। এইখানে রেসিপি বুক দেখে প্রোডাকশন করতে পারছেন, এইরকম আর কোথাও নেই। অনেককেই পাবেন যারা আপনাকে কিছুই শেখাবে না। কারণ তারা জানেই ওইটুকুই। তারা ভাবে শিখিই ফেললয়ে তাদের আর চাকরি থাকবে না, তাই তারা অনেক কিছু ধরে রাখে, হাজার চেষ্টা করলেও বাহির করতে পারবেন না। তখন এইসব কথা গুলো আমার কাছে ভিত্তিহীন লাগতো। একসাথে কাজ করলে তো এমনিতেই অনেক কিছু শেখা হয়ে যায়। আর রেসিপি যদি না দেয়, যদি ফলো না করি তাহলে প্রোডাকশন করবো কিভাবে। এইসব কিছু ভেবে তখন ওই কথা গুলো মাথায় নেইনি। ফিলিপ শেফ প্রায় সময় বলতো ওরা এখানে আসছে আমাদের কে হেল্প করার জন্য, নিজেরা কিছু শেখার জন্য। তারা বিনা পয়সায় এইখানে শ্রম দিচ্ছে তাই আমাদের ও দ্বায়িত্ব আছে তাদের কে যতটুকু সম্ভব শেখানোর যেন তারা সামনে এগোতে পারে। আমার সব সময় ওনার এই কথা গুলো মাথায় ঘুরতো। আবার উনি এটাও বলতো এইখান থেকে বাহিরে যখন যাবা তখন বুঝতে পারবা তোমরা কাদের সাথে কাজ করছিলে। আমার মাথায় বারবার ওনাদের ওই কথা গুলো ঘুরছিলো দিগন্ত কথা গুলো শোনার পর।

কিছুটা মন খারাপ হলেও যাওয়ার কোন রাস্তা নেই। সামনেই এগিয়ে যেতে হবে। এরপর মিরাজ শেফ আমাদের কে কিছু জিনিস শেখায়, উনি নিজে এসে আমাদের কে দেখিয়ে দিয়ে যেত, এরপর ওইগুলো আমরা প্রোডাকশন করা শুরু করি। রেসিপি গুলো কম্পেয়ার করে দেখলাম এক এক জায়গায় এক এক রকম। আমিও যে জিনিস গুলো জানতাম ওইগুলাও মিরাজ শেফের সাথে শেয়ার করতাম। আমরা বিভিন্ন ফুড নিয়ে আলোচনা করতাম, উনি অনেক অনেক কিছু জানতো। ওনার থেকে শেখার চেষ্টা করতাম। যদিও খুব অল্প সময় ওনাকে পেতাম আমরা। আর এইদিকে যার সাথে কাজ করি সারাদিন উনি মোবাইল দেখে আর কাজ করে, অনেকবারই ওনার কাছ থেকে কিছু জিনিস শিখার জন্য চেষ্টা করেছি কিন্তু এমন এক মানুষ কিছুতো শেখায়ও না, দেখতেও দিতোসনা। অন্য কাজে ব্যস্ত বানিয়ে দিত। এভাবে ১ মাস গেল। ইমরান তখন বলতো ভাই আমরা এইখানে থেকে কি শিখবো বলেন, এইখানে যা আছে সব কিছুই তো আমরা করে আসছি। যা জানি না ওইগুলা তো উনি সিন্দুক এর মধ্যে ঢুকিয়ে রেখেছে। আমরা জানলে বড় বড় শেফ হয়ে যাব মনে হয়। আমি সব সময় বলতাম আশাহত হস না, ধৈর্য রাখ একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। প্রথম মাসের স্যালারি হাতে পেলাম সার্ভিস চার্জ + বেতন সহ ৮,৪০০টাকা। আমি অক্টোবরের ১০ তারিখ জয়েন করি, তাই ১০ দিনের স্যালারি আর সার্ভিস চার্জ কেটে রেখে দিছিলো। ১৬টা ৫০০শ টাকার নোট দেখে আমি খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়ি। জীবনের প্রথম ইনকাম, প্রথম মাসের স্যালারি, আমার আনন্দ ঠেকায় কে। বাবা-মা- ছোট ভাই, সবাইকে ভাগ-যোগ করে দেই। নিজের হাত খরচ গাড়িভাড়ার জন্য কিছু রেখে।

 

চলতে চলতে একসময় মিরাজ শেফ ও আয়ারল্যান্ড চলে যায়, এরপর থেকে নিজেকে আরো বেশি একা একা লাগা শুরু হয়। যে মানুষ টার কাছে দুঃখ-কষ্ট শেয়ার করতাম সেই মানুষ টাও নাই। শেফের কাছ থেকে অনেক অনুপ্রেরণা পেতাম, স্বপ্ন গুলো দেখতাম, শেখার অনেক কিছু ছিলো ওনার থেকে কিন্তু হলো না আর। থমকে যাই আবার। নতুন কিছু আর জানতে পারছি না, শিখতেও পারছি না। এইসময়ে আমার নিজের শেখার বয়স জানার বয়স, কিন্তু সেখানে আমি নিজে যা জানি, যতটুকু জানি তা অন্যদের শিখিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমাকে কে শেখাচ্ছে।আমার সিনিয়র? আমি একটা বড় ভুল করি এইটুকু পথ চলার সময়, মিরাজ শেফ থাকাকালীন একবার চট্রগ্রাম থেকে ফোন আসে Hotel Peninsula থেকে। ফোন দিয়ে বললো ফুড ট্রায়াল আর ইন্টারভিউ দিতে যেতে পারবো কিনা। আমিও রাজি হয়ে যাই। পরেরদিন অফ ছিলো কাকতালীয় ভাবে। রাতেই ঢাকা থেকে চট্রগ্রাম চলে যাই। ফুড ট্রায়াল + ইন্টারভিউ সব দিলাম। ওনারা আমার ফুডের খুব প্রশংসা করলো হোটেলের জিএম, পেস্ট্রি শেফ, এক্সিকিউটিভ শেফ, সু-শেফ, এবং অন্যান্য ডিপার্টমেন্টের ও কয়েকজন ছিলো। কিন্তু ভাইবার সময় আমাকে কমিস ৩ হিসাবে ঢুকার প্রস্তাব দিল। আমি হুট করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে একদিন সময় নেই, অনেকেই নিরুৎসাহিত করছে হোটেলের অবস্থা ভালো না, ভিতরগত অনেক সমস্যা। কিন্তু আমি রাজি হয়ে যাই, ওনাদের কে জানাই আমি জয়েন করতে চাই। ওনারা বললো আচ্ছা আমরা জানাচ্ছি, এই বলে প্রায় ৩ মাস চলে যায়। আমিও আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম, ভেবেছি হয়তো আমি ১ দিন সময় চাওয়াটা ওনারা ভালো চোখে নেন নাই। এরমধ্যে আমি বর্তমান যেখানে রয়েছি স্যারদের চোখে পড়ি, একজন পার্টনার আছেন যিনি আমাদের ফুড গুলো + যারা কাজ করছে তাদের নিয়ে দেখেন। ৩ জন পার্টনার ৩টা সেক্টর দেখেন। মিরাজ শেফ চলে যাওয়ার পর স্যার জানতে পারে আমার পড়ালেখা আর কোর্স + ইন্টার্নি সম্পর্কে। মিরাজ শেফ যাওয়ার আগে স্যাররা শেফ কে কিছু নতুন পেস্ট্রি বানাতে বলে যায়।

মিরাজ শেফ এর শেষ মুহূর্তে ওনার হাতে বেশি সময় ছিলো না, উনি কিছু ডিরেকশন দিয়ে যায়, পাশাপাশি কিছু রেসিপি দিয়ে যায় যেখান থেকে আমি কিছুটা আইডিয়া করতে পারবো। ওনার ওই রেসিপি গুলো ফলো করে দেখলাম অনেকটাই ডিফারেন্স, কোন ভাবে হচ্ছে না। এরপর নিজে আরো কিছু ঘাটাঘাটি করেও কোন ভাবে পারছিলাম না। এরপর হঠাৎ মনে পড়লো ফাস্ট কান্ট্রির প্রোডাক্ট গুলোর সাথে আমাদের প্রোডাক্ট গুলোর বিভিন্ন মাপের কিংবা মেজারমেন্টের অমিল রয়েছে এই যেমন ডিম। এরপর ওইভাবে সংযোজন করে অবশেষে বিভিন্ন আইটেম বানাতে সক্ষম হই এবং স্যারদের ও পছন্দ হয়। এরপর থেকেই হাসিব স্যার যিনি আমাদের রেস্টুরেন্টের একজন বড় পার্টনার এবং ওনার ফুড সম্পর্কেও অনেক কিছু নলেজ রয়েছে, উনি নিজেকে একজন বাবুর্চি ও বলে থাকে মাঝেমধ্যে ওনার নজরে চলে আসি। এরপর থেকেই বিভিন্ন জিনিস আসলে আমাকে ডেকে নিয়ে কথা বলা, বিভিন্ন ফুডের দ্বায়িত্ব আমাকে দেওয়া শুরু করে। এরপর একদিন ওই হোটেল থেকে ফোন আসে, আমি জয়েন করতে পারবো কিনা, আমিও রাজি হয়ে যাই। কারণ এইখানে থেকে আমি নিজেকে developed করতে পারছি না। আমি নতুন কিছুই শিখতে পারছিলাম না, এবং অনেক কিছুই ছিলো যা আমার সিনিয়র যিনি রয়েছেন উনি এখনো আমাকে ওইসব কিছু শেখাননা। শিখতে চাইলেও উনি আমাকে বিভিন্ন কাজে লাগিয়ে দেন, যার কোন প্রয়োজন ও নাই৷ কয়েকবার এইরকম হওয়ার পর আমি বুঝতে পারি উনি আমাকে শেখাতে চাননা। তাই আমিও আর আগ্রহ দেখাতাম না। এইটা শুধু আমার ক্ষেত্রেই না, আমার সাথে আরো দুইজন যারা রয়েছেন সবার ক্ষেত্রেই। এইজন্য সব কিছু মিলিয়ে আমি ১ মাস সময় নেই। যেহেতু আমি বর্তমানে একটা জায়গায় কাজে রয়েছি। ওনারা আমাকে Appointment লেটার পাঠিয়ে দেয় এবং আমি স্বাক্ষর করে পাঠিয়েও দেই। বিপত্তি টা তখনি শুরু যখন আমি রিজাইন লেটার জমা দি। স্যার আমাকে ডাকে, আমি কেন রিজাইন দিলাম। আমিও ওনার কাছে কোন কিছু লুকাইনি, কারণ মিথ্যা বলা আমার অপছন্দের একটা ব্যাপার, আমি ওনাকে বলি স্যার আমি শিখতে চাই, জানতে চাই, নিজেকে আরো বেশি developed করতে চাই। আমার ক্যারিয়ারটা স্যার বেশি দিন হয় নাই, কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে আমি একটা জায়গায় আটকিয়ে গেয়েছি। সময় যাচ্ছে স্যার কিন্তু আমি সময়ের সাথে যেতে পারছি না। ওনাকে এইসব বলার পর উনি কিছুটা অবাক হয়ে যায়।

এরপর উনি বললো আপনি যেয়েননা, আপনি এইখানে থাকেন। আমি খুব সাহস নিয়ে বললাম স্যার আমি শিখতে চাই৷ এরপর উনি নামাজ পড়তে চলে যায়, বললো এসে কথা বলবে। সন্ধ্যার পর উনি আর ম্যানেজার আসলো, আবার আমাকে ডাকলো। ম্যানেজার স্যার আমাকে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন শুরু করলেন এই যেমন এইখানে কাজ করতে কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা, কেউ কিছু বলেছে কিনা, শেফ এর সাথে কোন কিছু হয়েছে কি না এইসব। আমি খুব হাসিখুশি ভাবেই উত্তর দিলাম না স্যার কোন সমস্যা নেই। এরপর হাসিব স্যার প্রশ্ন করা শুরু করলেন এবং একটা পর্যায়ে উনি আমাকে নিজের মেয়ের সাথে তুলনা দিয়ে ছেলেতুল্য হিসাবে অনুরোধ করে বসলেন। কথাটা শুনে ম্যানেজার সহ আমিও কিছুটা হতভম্ব হয়ে যাই। এরপর স্যার নিজে থেকে আরো অনেক কথা বলা শুরু করলেন, আমি বুঝতে পারছি আপনি কেন যেতে চাচ্ছেন, আমাদের প্ল্যান আরো বড়, একজন নতুন শেফ আসবে। কিছুটা সময় লাগবে ওনার আসতে এইরকম অনেক কথা। একজন এমডির কাছ থেকে এইসব কথা, এত অল্প বয়সে আমার শোনা ছিলো অনেক বড় ব্যাপার। আমি নিজেকে সব সময়ই অনেক ছোট মানুষ মনে করি। আমার বয়স টাও বা আর কত কিংবা এক্সপেরিয়েন্স। আমি স্যারের কাছ থেকে ফ্যামিলির সাথে কথা বলার জন্য সময় নি। আমার শুভাকাঙ্ক্ষী অনেকের সাথে আলাপ করি, কারণ আমি সিদ্ধানহীনতায় পরে গেলাম। এবং পরিচিত কিছু শেফের সাথে কথা বলি আমি কি করতাম, যখন ওনারা পেনিন্সুয়ালার নাম শুনলো তখন অনেক শেফই আমাকে নিরুৎসাহিত করে যাওয়ার জন্য, ওইখানে নাকি সমস্যা রয়েছে ম্যানেজমেন্ট কেন্দ্রিক এবং পুরাতন কিছু শেফদের যারা নিজেদের পরিচিত মানু্ষের বাইরে ছাড়া অন্য কাওকে বেশিদিন থাকতে দেয় না বিভিন্ন চাপ প্রয়োগ করে। এইজন্য ওইখানে নাকি প্রতিমাসে মানুষ নিয়োগ হয় এবং প্রতিমাসেই বের হয়। এইগুলা শুনে আমি আরো হতাশ হয়ে পড়লাম। আমি আরো গভীরে খবর নেওয়া শুরু করলাম সবারই একই কথা। মিরাজ শেফ এর সাথে কথা বললাম, ইভেন স্যার নাকি ওনাকেও ফোন দিয়ে বলছে আমাকে থাকার জন্য বুঝানোর জন্য। আমি অবাক হলাম অনেক, কিন্তু শেফকে আমি প্রতিনিয়ত আপডেট জানাতাম কি করছি কি হচ্ছে।

উনিও স্যার কে বললো সে থাকবে না, বিভিন্ন রিজন ও বললো। আমি খুব প্রেশারের মধ্যে পরে যাই,এইদিকে বাবা-মায়ের স্বপ্ন হচ্ছে এমবিএ কমপ্লিট করা, ওনারা এমবিএ কমপ্লিট করতে পারে নাই, আগেই চাকরিতে ঢুকে যাওয়ার জন্য। বাকিরাও নিরুৎসাহিত করতেছে। আমি বুঝতেছিলাম না কি করবো।স্যার যেহেতু বলছে নতুন একজন ভালো শেফ আসবে পেস্ট্রিতে ,এবং এতো করে বলছে,পাশাপাশি ওইখানে যেহেতু যাওয়ার আগেই এতো সমস্যা শুনতেছি, ফ্যামিলি মেম্বাররা সব শোনার পর বলতেছে এইখানেই থাকতে তোমার স্যার যেহেতু তোমাকে বিভিন্ন কমিটমেন্ট দিচ্ছে দেখো না কি হয়, তোমার তো বয়স শেষ হয়ে যাচ্ছে না। নিশ্চয়ই তোমার মধ্যে কিছু আছে বলেই উনি চাচ্ছে, সেক্ষেত্রে উনি যদি সে কমিটমেন্ট নাও রাখে পরে অন্য কোথাও ঠিকই তুমি যেতে পারবা, আমরা বিশ্বাস করি এবং সেটা তোমার ও বিশ্বাস করা উচিৎ। সব কিছু মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম থাকবো, যেটা এখন মনে হয় মাঝেমধ্যে ভুল করছিলাম। আমার প্রতি স্যারের এতো আগ্রহ দেখে আমি অনেকের চোখের শত্রু হতে শুরু করলাম, এবং প্রতিনিয়ত বিভিন্ন কিছু সহ্য করে আমাকে মানিয়ে নিয়ে চলতে হচ্ছে এখন। স্যার বলতো আপনার যে সততা আপনার মধ্যে রয়েছে তা আপনি বজায় রাখুন দেখবেন অনেকেই ভয় পেয়ে যাবে আস্তে আস্তে। কিন্তু সব কিছু কিংবা সিচুয়েশন গুলো তো স্যারকে বললে উনি বুঝবে না। এটাও ভাবতে পারে সুযোগ কিংবা আদর করে বলে বাড়তি সুবিধা চাচ্ছি। একটা বৃত্তের মধ্যে আটকা পরে গিয়ে দিন যাচ্ছে এখন আমার……. আমি এই বৃত্ত থেকে বের হতে চাই।

 

আজকে যার জন্য গত ২৬ দিন ধরে অল্প অল্প করে আমার জীবনের এই গল্প টি লেখলাম উনি হচ্ছে আমার শেফ এর মেন্টর। যার কথা এবং গল্প মিরাজ শেফ থাকাকালীন অনেক শুনতাম। উনি সব সময় নিজের সকল অর্জন এর ক্রেডিট এই মানুষ টা কে দিতেন। একদিন উনি ওনার মোবাইল থেকে মানুষ টার ছবি এবং কিছু লেখা দেখায়, আমিও মন দিয়ে পড়ি। প্রথম দেখায় মানুষ টাকে আমার ভিষণ ভয় লাগে,বলে বসি শেফ উনি মনে হয় অনেক রাগী মানুষ হ্যাঁ। তখন শেফ হাসলেন এবং বললেন কাজের ব্যাপারে উনি যথেষ্ট সিরিয়াস আর কাজের বাইরে উনি তোমার সাথে সিগারেট খেতেও যাবে যদি তুমি ওনার মন জিততে পারো। আমি শুরু থেকে Gordon Ramsay অনেক শো দেখতাম টিভিতে, মোবাইলে। মাঝেমাঝে ইচ্ছাও জাগতো ওনার সাথে ইশ যদি একবার দেখা হতো। কাজ এবং ফুডের প্রতি তার সিরিয়াসনেস টা আমাকে অনেক অবাক করতো। এখন বুঝতে পারি কেন তিনি ছোট ছোট ভুল গুলোকেও এতো বড় করে দেখেন। তার একটি প্রবাদ আমি ট্রেনিং অবস্থায় থাকা কালিন শুনি এবং যা আমার মনের ভিতর থেকে যায় ‘If you want to become a Great Chef, you have to work with Great Chefs.And that’s exactly what i did – Gordon Ramsay’

#আমি গ্রেট শেফ কিংবা মিরাজ শেফের কাছ থেকে জানা মেন্টর সম্পর্কে যখন শুনি তখন নিজের মধ্যে খুব আফসোস হতো। একজন মেন্টর এর আফসোস আমার অনেক আগে থেকেই ছিলো যখন ইন্টার্নিতে ছিলাম তখন থেকেই। কিন্তু সেখানে আমি এমন কিছু মানুষকে পেয়েছি যাদের কাছ থেকে অনেক কিছুই শিখেছি, যা আজকে আমাকে এই আমিতে পরিনত করেছে। এইভাবে একদিন মিরাজ শেফের ফেসবুকের প্রোফাইলে ঢুকে জেভিয়ার শেফ এর বিভিন্ন গ্রুপ কিংবা পেইজ ফলো করা শুরু করি। ওনার লেখা গুলো পড়ি, প্রতিনিয়ত কিছু নতুন নতুন জিনিস গুলো শিখতে থাকি। যা আমাদের কে ইন্সটিটিউটেও শিখায় নি। এই যেমন ফুডের ইতিহাস কিংবা শেফদের ইতিহাস সম্পর্কে। অনেক নতুন ইনগ্রিডিয়েন্ট, ফিশ কিংবা সবজি এইসব সম্পর্কে অনেক বিস্তারিত তথ্য পাশাপাশি মোটিভেশন এবং হাল না ছাড়ার অনুপ্রেরণা এইসব কিছু। ওনার নিজের ইচ্ছা কিংবা বাংলাদেশের স্বপ্নবাজদের নিয়ে নিজের ইচ্ছা গুলো পড়তে থাকি। একদিন সকালে ফেসবুকে দেখি একটা ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট আসছে এবং আমি আকাশ থেকে পরি যখন দেখি জেভিয়ার শেফের ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট। আমি বিশ্বাস ও করতে পারছিলাম না। শেফ কে এ্যাড করার পর আমার অনেকবারই ইচ্ছা করছিলো একটা ম্যাসেজ দিব কিন্তু সাহস পাচ্ছিলাম না কেন জানি ভয় ভয় লাগতো, হয়তো শ্রদ্ধা থেকে। তাই আর দেওয়া হলো না।

#এরপর একদিন উনি একটা কুইজ দিলেন এবং বললেন সঠিক উত্তর দেওয়া প্রথম তিনজনের সাথে উনি কথা বলবেন। আমি আর দেরি না করে চিন্তা করা শুরু করলাম কিন্তু মনে আসছিলো না। এরপর ভাবলাম দেখেই উত্তর দেই,পরে না হয় শেফ কে সরি বলবো কিংবা উত্তর এর নিচে সত্যি টা লিখে দিব। যে চিন্তা সেই কাজ লিখে দিলাম। এরপর শেফ রিপ্লাই দিলেন নাম্বার এর জন্য। আমি যে কি পরিমাণ খুশি হয়েছিলাম। তারপর যথারীতি শেফ কে নক করলাম এবং ওনার সাথে কথা বলার পর আমি মানসিক ভাবে অনেকটা হালকা হই এবং নিজের স্বপ্ন গুলো আবার দেখা শুরু করলাম। এতো বড় মাপের একজন শেফ যখন আমাকে চ্যাম্পিয়ন বলেছিলো এবং বললো তোমাকে চ্যাম্পিয়ন হতেই হবে তখন চোখে পানি চলে আসে,কারণ আমি চ্যাম্পিয়ন ডাক টা শুনতে চাই, আমি চ্যাম্পিয়ন হতে চাই এরজন্য আমি ক্ষুধার্ত এবং মরিয়া।

#আমাকে আমার জীবনের গল্প লিখার প্রথম এ্যাসাইনমেন্ট টা শেফ দিলো, যা আজকে শেষ করতে পেরে আমি খুব আনন্দিত। যদিও অনেক সময় লেগেছে, কিন্তু প্রতিটা অধ্যায় লিখার সময় আমি সেই আগের জায়গায় হারিয়ে যেতাম, অনুভব করতাম ওই সময় গুলো। যার জন্য আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। এরমধ্যে আমি আমার এম এ এর ফাইনাল পরীক্ষা টাও শেষ করে ফেলি এখন শুধু একটা ফাইনাল ভাইবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি…..

সিমান্ত

Join the Conversation

  1. সীমান্তর জীবন থেকে অনেক কিছু শিখার আছে। নতুনদের

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close
Your custom text © Copyright 2024. All rights reserved.
Close