নিজেকে বদলে ফেলুন…

23

রান্না কে আমাদের সমাজের অনেকে মেয়েদের কাজ বা মেয়েলি কাজ হিসেবে বোঝে। এখন যদি সেই আপনি রেস্টুরেন্টে খেতে যান, কে খাবার টা কুক করছে আপনার জন্য? আপনি সেটা খুব ভালো করে জানেন, তাই না? আপনার ফুডটা কোন এক ছেলে রান্না করবে। সে ছেলে প্রফেশনাল রান্নাঘরে রান্না করছে আর আপনি প্রতিনিয়ত খাচ্ছেন। তবুও মনে মনে বলবেন শেফ জব…মানে বাবুর্চি? জিনিসটা কেমন হয়ে গেলো না? এইখানে আপনার মনোভাবের সমস্যা রান্না-মেয়ে-ছেলে-পেশা মানে এই শব্দ গুলোতে। আপনি বা আপনাদের এই মানসিকতার জন্য দেশ, সমাজ আর ব্যাক্তি উন্নতিতে পিছিয়ে যাচ্ছে। আর আপনি, আমি ভেবে বসে আছি রান্না কি আবার একটা পেশা হতে পারে? পরের কয়েকটি প্যারা আপনাদের মত কিছু মানুষের জন্য।

আপনি হয়তো জানেন না, রান্না নিয়ে পড়ালেখা কত ব্যয়বহুল, কত শ্রম দিতে হয়, কিভাবে স্কিল ডেভেলপ করতে হয়, কত ত্যাগ আর সেক্রিফাইস করতে হয় আবার অন্যদিক দিয়ে ভাবলে খুব অল্প সময়ে রান্নার ক্যারিয়ার তৈরি করে ফেলা যায়। আপনি নিজে যদি একটা রেস্টুরেন্ট বা ভালো একটা রেস্টুরেন্টের হেড শেফের জব করেন আপনি খুব ভালো মানের একটা ইনকাম করতে পারবেন। আপনার টাকা ফ্যামিলি, দেশ সবার কাজে লাগবে। তার থেকে বড় কথা সঠিক নিয়মে আপনি নিজেকে এমন একটা পেশা যাতে সৃজনশীলতা, এডভেঞ্চার আর প্রতিনিয়ত নতুন কিছুর আহবান আছে। একবার যদি মন থেকে এই শিল্প আপনি ভালোবাসতে পারেন, খুব অল্পসময়ে আপনি একজন ফুডের শিল্পী হয়ে উঠবেন। ভুলে যাবে না একে বলে Culinary Arts মানে রন্ধনশিল্প।

এবার আসি পাশের দেশ ইন্ডিয়া নিয়ে। পাশের দেশ ইন্ডিয়া এরা অন্যান্য অনেক কিছুর মত দুনিয়াতে কুকিং টাকে ও নিয়ন্ত্রন করে, এত বেশি ইন্টারন্যাশনাল কালিনারি স্টুডেন্ট আপনি বাইরের দেশের প্রতিটি ইউনিভার্সিটিতে দেখতে পাবেন।

আপনি বিশ্বাস করবেন না। আমি গত বছর আমার পুরোতন ইউনিভার্সিটির আমার থিসিস এর সুপারভাইজারের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম উনি আমাকে বললো ৯০/৯৫% আন্তজার্তিক ছাত্র-ছাত্রী আসছে ইন্ডিয়া থেকে কালিনারিতে। আমি একটা ডিগ্রির কথা বলছি, মানে MA in Culinary Arts Management ডিগ্রি। একটা সেমিস্টারে ৭০ এর মধ্যে ৬০ জন আমাদের পাশের দেশের। কি মনে হয় তারা এত টাকা এমনি এমনি খরচ করতে গিয়েছে? তাছাড়া, আমি পুরো পৃথিবীর কালিনারির একটু হলেও খবর রাখি। আপনি পুরো দুনিয়াজুড়ে এত এত রেস্টুরেন্ট আর হোটেল পাবেন যাদের হেড শেফ ইন্ডিয়ান (এমনকি অন্য সাবজেক্ট তারা স্কলারশিপ এর জন্য বসে থাকে না, নিজের টাকা দিয়ে পড়তে চলে আসে এবং যে ইনভেস্ট করছে তা তুলে ফেলে)। তারা যে কালিনারির পরিবেশ তৈরি করছে, সেই পরিবেশ আমাদের দেশ আগামী ২০/২৫ বছরেও পারবে না। তাদের যে স্কিল শেফ তারা দুনিয়ার সব জায়গায় কাজ করার ক্ষমতা রাখে, আর তরুণ শেফরা এমন এক পরিবেশ পাচ্ছে তাদের দেশে, এমনকি তাদের ইন্সটিটিউট এর সাথে অনেক বাইরের ইউনিভার্সিটির একাডেমিক চুক্তি বা যোগাযোগ থাকে, খুব সুন্দর একটা পরিবেশে তারা উঠে আসছে।

মানে প্রতিবছর হাজার হাজার তরুণ শেফ উঠে আসছে দেশ আর বিদেশ থেকে। আবার অন্যদিকে, আপনি যদি ইন্ডিয়ার চার বা পাঁচ তারকা হোটেলের প্রধান শেফ কে দেখেন তাদের ৯৯.৯৯% নিজস্ব বা ভারতীয়। ভাবুন একবার, তাদের মানসিকতা। এই দেশ বিদেশের এই কালিনারির ছাত্র ছাত্রীরা ভালো ভালো পজিশনে জব করবে। তাছাড়া আপনি মিডলইস্ট, গ্রেট ব্রিটেন, ইউরোপ, আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়া যেখানে যান না কেন ঝাঁকে-ঝাঁকে ইন্ডিয়ান শেফ দেখতে পাবেন এবং অনেকে আছেন প্রধান শেফ হিসেবে। আমি রেস্পেক্ট করি এই উঠে আসা কে।

শুরু করেছিলাম দেশের কিছু মানুষের মানসিকতা নিয়ে। আমাদের দেশের বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে এখনো গতানুগতিক সেই পড়ালেখা মানে ইউনিভার্সিটিতে পড়বে, ৪/৫ বছর পড়ার পর জবের পিছুনে ছুটতে থাকে, আর তাদের বেশিরভাগ মানুষ শেফ পেশা, রান্না এইগুলো নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করবে। এই পেশাটা অসাধারণ, যদি সঠিক ভাবে আপনাকে বেড়ে উঠতে দেয়। একজন লিডার এর মেন্টরশিপে নিজেকে আলোকিত করতে পারলে আপনি এগিয়ে যাবেন দেশ বিদেশে। যত দ্রুত আগাতে পারবেন বয়স তিরিশের আগে আপনি একজন প্রতিষ্ঠিত শেফ। আজ থেকে কয় এক বছর পর আমার দেশের ছেলেরা আমাদের তারকা হোটেলগুলোর প্রধান শেফ হিসেবে দায়িত্ব নেবে। এখন আমাদের দেশের কয়টা শেফ প্রধান শেফ হিসেবে দেশের তারকা হোটেলগুলোতে জব করছে?

একদিন আমি দেখতে চাই, একঝাঁক শেফ উঠে আসবে, যাদের থাকবে স্কিল, প্যাশন, আগ্রহ, ক্ষমতা, একাগ্রতা আর নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতা। তখন আমাদের দেশের শেফরা আন্তজার্তিক ভাবে সমাদৃত হবে, তাদের নিয়ন্ত্রণে অন্য দেশের শেফরা থাকবে। তারা ফুডের মাস্টারপিস তৈরি করবে।

ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close
Your custom text © Copyright 2024. All rights reserved.
Close