কেন সিদ্ধ করার আগে লবস্টার মারতে হবে?

36

লবস্টার ক্রাস্টেসিয়ান পরিবারের সামুদ্রিক প্রাণী। এটি ক্রস্টেসিয়ান প্রজাতির প্রাণীগুলোর একটি। এরা ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বেঁচে থাকতে পারে। এদের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে বার্ধক্য হয় না। এরা ‘Molting’ এর মাধ্যমে বৃদ্ধি পায়। যার জন্য এদের খোলস প্রতিস্থাপন করতে হয়। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া সংগঠনের জন্য এদের প্রচুর শক্তি ব্যয় করতে হয়। এক পর্যায়ে অত্যাধিক শক্তি ব্যয়ের ফলে এদের মৃত্যু ঘটে। সারা বিশ্বে ১০০ টিরও বেশি জাতের লবস্টার রয়েছে। এদের বাহ্যিক শক্ত আবরনযুক্ত হলেও এরা অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সুক্ষ প্রাণী। এদের স্নায়ুতন্ত্র প্রচন্ড সজাগ থাকে। এদের দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণ শক্তি কম হলেও এরা সবকিছু অনুভব করতে পারে। এর খোলস থেকে হাজার হাজার চুলের অস্ত্বিত্ব পাওয়া যায়। যার কারণে এরা যেকোনো কিছুর সংস্পর্শে আসলে উপস্থিতি অনুভব করতে পারে। তাপমাত্রা পরিবর্তনের জন্যেও এরা সংবেদনশীল। সঠিক তাপমাত্রার সন্ধানের জন্য ১৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত অনুসন্ধান কার্যক্রমচালনা করে, শুধুমাত্র প্রজননের জন্য। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ক্রাস্টেসিয়ানরা মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মতোই সব কিছু অনুভব করতে পারে।

লবস্টারের মস্তিষ্কে গ্যাংগলিয়া নামক ১৫ টি Nerve Cluster(নার্ভ ক্লাস্টার) রয়েছে যা তাদের শরীরের সকল অঙ্গপ্রত্যাঙ্গের সাথে জড়িত। এর চোখের মাঝ বরাবর মেইন গ্যাংলিয় থাকে। সকল গ্যাংগলিয়ন শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের সংবেদনশীল তথ্য পরিচালনা ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এদের মস্তিষ্কে সেরিব্রাল নেই যা ব্যথা অনুভব করার নার্ভ। তবুও এদের সেই সংবেদনশীলতা রয়েছে।

এতসময় এই সংবেদনশীলতা নিয়ে অলোচনার মূল বিষয় টি কি আপনারা বুঝতে পেরেছেন? মুলত একটি প্রশ্ন বা বিতর্ক হলো- কেন লবস্টারকে সিদ্ধ করার পূর্বে মারতে হয়? 

এটাকে প্রশ্ন বা বিতর্ক ২ টাই বলা যেতে পারে। কারণ, কিছু মানুষ মনে করেন লবস্টার জীবিত সিদ্ধ করা উচিত ও ভালো। অন্য দিকে বলা হচ্ছে লবস্টারকে রান্নার পূর্বে মারতে হয়। চলুন আজ এই ২ টি বিতর্কতার ব্যখ্যা করা যাক।

অনেকেই ধারণা করে লবস্টাররের ব্যথা অনুভব হয় না। কিন্তু বিজ্ঞান ও গবেষণা এই ধারণাকে একেবারে ভুল প্রমাণ করেছে। এর উপরে রয়েছে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। বিজ্ঞান গবেষণার মধ্যমে সত্যতা উন্মোচন করেছে। লবস্টারকে জীবন্ত সিদ্ধ করলে, জীবিত অবস্থায় নখর উঠালে মানুষের মতোই এরা ব্যাথা অনুভব করে। এনিমেল বিহেভিয়ার গবেষকদের মতে- ‘রান্নার পূর্বে লবস্টারকে মারা উচিত ‘। উত্তর আয়ারল্যান্ডের কুইন্স ইউনিভার্সিটির এনিমেল বিহেভিয়ার ইমেরিটাস অধ্যাপক “রবার্ট এনউড” এক দশকের বেশি সময় ধরে অনেক গবেষণার পরে জানান- ক্রাস্টেসিয়ানরা ব্যথা অনুভব করতে পারে। 

এর পেশীতে টিস্যু থাকে। যা এর মৃত্যুর পরে সংকুচিত হয়ে শক্ত হয়ে যায়। প্রাণীবিদের মতে, লবস্টার প্রচন্ড ব্যাথা ও কষ্টের সংস্পর্শে আসলে তখনও এর স্নায়ূ কাজ করে। এটা ফুটন্ত গরম পানিতে দেওয়ার পর ৩৫-৪৫ সেকেন্ডের মধ্যে এর শরীরের পেশীগুলো সংকুচিত হয়ে মারা যায়। এই সংকোচন হওয়া- ‘Rigor Mortis’ নামে পরিচিত। এর কারণ সোলুলোর শ্বসন বন্ধ হয়ে যায় ফলে পেশীগুলোতে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে। এর পরেও লবস্টারের স্নায়ু ১ ঘন্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকে। যার কারণ এরা যন্ত্রণা অনুভব করতে পারে।

লবস্টার প্রক্রিকরণের কারখানায় PETA সংস্থা প্রথম আন্ডারকাভার ফিল্ম করে। সেখানে দেখা যায় লবস্টার ও ক্রাবগুলোকে (উভয়েই ক্রাস্টেসিয়ান পরিবারের সদস্য) কেটে অর্ধেক করে নিয়ে ধাতব স্পাইকে চালানো হয় ও শরীরের ভেতরের অংশগুলোকে টেনে বের করে ফেলে, নখরগুলোকে উপরে ফেলে। এরপরও এদের মৃত্যু ঘটে না। 

এরা স্পষ্টভাবে ১ ঘন্টা পর্যন্ত জীবত ছিলো। যা অত্যন্ত পীড়াদায়ক দৃশ্য। এই ঘটনার প্রেক্ষাপট থেকে বোঝা যায় এদের জীবন্ত অবস্থায় প্রক্রিয়াকরণ করলে এদের অসহনীয় যন্ত্রনা পেতে হয়। যা নিজের মানবিকতাকে ছোট করে।

লবস্টারকে সিদ্ধ করার পূর্বে মেরে ফেলা উচিত। তাহলে এদের অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় না। লবস্টরকে মারার জন্য একটি পদ্ধতি হলো ৫-১০ মিনিট একে ফ্রিজে রাখা। এতে লবস্টার আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পরে। তবে দীর্ঘ সময় ফ্রিজে রাখলে এটি হিমায়িত হয়ে যাবে। ফলে রান্নায় এর স্বাদের পরিবর্তন ঘটবে অর্থাৎ স্বাদ কমে যাবে।

যাইহোক, ৫-১০ মিনিট পর ফ্রিজ থেকে বের করে এটি একটি কাটিং বোর্ডের উপর নিয়ে এর ক্যারাপেস থেকে পিছনে ও প্রথম জয়েন্ট পর্যন্ত এর চোখের নার্ভ থাকে, ঠিক সেই স্থানে ছুরির ডগা রেখে চাপ দিতে হবে এমনভাবে যেন ছুরির ডগা চপিং বোর্ড পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তখনই লবস্টারের স্নায়ুতন্ত্র থেমে গিয়ে ততক্ষণাৎ মৃত্যু ঘটবে। ও এটি বয়েল, গ্রিল, স্টিম, পোচ, সেল যেকোনো রেসিপিতে সংযোগ করা যেতে পারে।

গবেষনার অনুসন্ধানে এ তথ্য জানা যায় লবস্টার জীবন্ত রান্না করার প্রধান কারণ ‘খাদ্য নিরাপত্তা’। এর মূল কারণ এটাই যে লবস্টারের একবার মৃত্যু ঘটলে কয়েক ঘন্টার মধ্যে এতে ব্যক্টেরিয়ার সৃষ্টি হয় প্রাকৃতিকভাবেই। এই ব্যাক্টেরিয়া রান্না করার পরেও বিনাশ হয় না। তাই জীবন্ত সিদ্ধ করলে এতে বিষক্রিয়া হওয়ায় সম্ভাবনা কম থাকে।

অন্যদিকে ‘State of maine food and seafty exparts’এর মতে- মৃত লবস্টার মৃত্যু হতে ২৪ ঘন্টা পর্যন্ত ৩৮° ফারেনহাইট এর নিচে রেফ্রিজারেটরে রাখা হলে তা গ্রহনযোগ্য হবে। এগুলো মৃত খাওয়া যায়। কোনো ক্ষতিকর কারন নেই বলে জানা যায়। কিন্তু এটি দ্রুত পচনশীল বলে দ্রুত খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে লেসি আইন পাস করা হয় যেখানে বণ্যপ্রাণী রক্ষার জন্য একটি আইন ছিলো ফেডারেল। শেষ পর্যায়ে জীবন্ত লবস্টারকে সিদ্ধ করাকে ফেডারেল অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। লেসি আইনে উল্লেখ ছিলো কোন রাজ্যের আইন লঙ্ঘন করে বা বিদেশী ও ভারতীয় উপজাতি আইন লঙ্ঘন করে কোনোও বণ্যপ্রাণী, মাছ ধরা বা দখল করা, পরিবহন করা ফেডারেল অপরাধ। পরবর্তিতে এটা সংশোধন করে বলা হয়েছে – কোনও বিদেশি আইন লঙ্ঘন করে কোনোও ধরনের বণ্যপ্রাণীকে হত্যা করা ফেডারেল অপরাধ। নিউজিল্যান্ডের আইনে জীবিত লবস্টারকে জীবন্ত অবস্থায় সিদ্ধ করলে প্রতিবার আইনলঙ্ঘন করার জন্য $10,000 জরিমানা – ৫ বছরের জেল এধরণের শাস্তি দেওয়া হয়।

সর্বোপরি তথ্যগুলো থেকে এটা স্পষ্ট যে লবস্টারকে সিদ্ধ করার আগে মারতে কেন হবে। এবার আপনারা বলুন এই আইন কতটুকু যুক্তিযুক্ত। আর বয়েল করার আগে লবস্টারগুলোকে মারা ঠিক কি না!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close
Your custom text © Copyright 2024. All rights reserved.
Close